রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর: ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি আহতদের

রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পূর্ণ হলেও বিশ্বের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম এই শিল্প দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের পরিবার এখনো পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে আসছে। বছর ঘুরে এ দিনটি এলেই নিহতদের স্মরণে নানা কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিক সংগঠন ও ভুক্তভোগীরা। গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়েই কেটে গেছে ১৩ বছর। তবে ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, নতুন সরকারের সময়ে কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত হবে।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে দিবসটি উপলক্ষে সাভারের রানা প্লাজার সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে অস্থায়ী শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে নিহত শ্রমিকদের স্মরণ করা হয়। এতে নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরাও অংশ নেন। একই কর্মসূচিতে তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরাও যোগ দেন।
কর্মসূচি থেকে ভবন মালিক সোহেল রানা ও তাজরীন ফ্যাশনের মালিক দেলোয়ার হোসেনের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়। প্রতি বছর ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্মরণ কর্মসূচি। ২৪ এপ্রিল সকালে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ভুক্তভোগীরা। তবে বছরের পর বছর ধরে চলা এই কর্মসূচির মধ্যেও পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি পূরণ হয়নি।
ভবন মালিক সোহেল রানা কারাগারে থাকলেও গার্মেন্টস মালিকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া এবং ক্ষতিপূরণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, বিদেশি সহায়তা ও বিভিন্ন তহবিলের অর্থ যথাযথভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছায়নি। শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে বহির্বিশ্ব থেকে আসা সামান্য কিছু সহায়তা দিয়ে বিগত সরকার দায় সেরেছে। এখন পর্যন্ত হয়নি বিচার, মানা হয়নি ভুক্তভোগীদের দাবিগুলো।
আহত শ্রমিক সাদ্দাম জানান, দুর্ঘটনার পর সামান্য সহায়তা পেলেও তা চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত কর্মসংস্থান থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি বলেন, রানা প্লাজায় আহত শুনলেই কেউ চাকরি দিতে চায় না। এখন আমাদের স্থায়ী পুনর্বাসন দরকার। প্রতি বছর সামান্য সহায়তা নয়।
মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া শিলা জানান, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ভারী কাজ করতে না পারায় পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রমিকদের পুঁজি করে বিভিন্ন পক্ষের ব্যবসা ও অর্থ আত্মসাতের কারণে দুর্ঘটনার এক যুগেও ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পাননি বলে অভিযোগ রানা প্লাজা সার্ভাইভাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদুল হাসান হৃদয়ের।
তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে শ্রমিকদের নিয়ে কয়েকটি পক্ষ ব্যবসা করে যাচ্ছে। অথচ কোটি কোটি টাকা আসছে, সহযোগিতা আসছে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে। আমরা শ্রমিকরা কিছুই পাই নাই। তাহলে এইগুলা গেল কোথায়? কারও না কারও পকেটে গেছে। অথচ রানা প্লাজা ধসের পর থেকে আমরা দাবি জানিয়ে আসছি, যে সহযোগিতা আসছে তা যেন ভুক্তভোগীরা পায়। এ নিয়ে সরকারও তেমন গুরুত্ব দেয়নি। যদি দিত, তাহলে ১৩ বছর পরও আমাদের এখানে আসতে হতো না। দাঁড়াতে হতো না।
এদিকে, ভবনটি ধসে পড়ার আগের দিন ফাটল দেখা দেয়। ওই সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তৎকালীন একুশে টেলিভিশনের সাভার সংবাদদাতা নাজমুল হুদা হামলার শিকার হন। তিনি বলেন, ফাটলের খবর পাওয়া মাত্র আমি ক্যামেরা নিয়ে পৌঁছে যাই ঘটনাস্থলে। ওইসময় রানা প্লাজার ফাটলের সংবাদ সংগ্রহ ও চিত্রধারণ কিন্তু সহজ ছিল না। ওই সময় বারবারই বাধা দেয় ভবনটির মালিক ও সাভার যুবলীগের নেতা সোহেল রানার লোকজন। তারা আমাকে মারধর করে, টেনেহিঁচড়ে নিচে নামিয়ে আনে। এরপর ক্যামেরার মেমোরি কার্ড নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু সেটি আমি পায়ে মোজার মধ্যে লুকিয়ে ফেলায় আর পায়নি। এরপর তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। এরপর সংবাদ প্রচার হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।
তিনি বলেন, রানা প্লাজার ভেতরে নিজের কার্যালয়ে বসেই আমাকে সাক্ষাৎকার দেন সোহেল রানা। তিনি বলেছিলেন, পিলারের ওখান থেকে একটু প্লাস্টার খুলে পড়েছে। মানুষ তিলকে বড় ঘটনা বানাচ্ছে। আমরা ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে দেখে এসেছি। ইঞ্জিনিয়ার বলেছে এটা ঝুঁকিপূর্ণ না।
এদিকে সংবাদ প্রচারের পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কবির হোসেন সরদার রানা প্লাজা পরিদর্শন করেন। তিনিও রানা প্লাজার মালিকের নিজস্ব প্রকৌশলী আব্দুর রাজ্জাকের বরাত দিয়ে জানান, এখানে বড় ঝুঁকি নেই।
এটা দুর্ঘটনা না, এটা হত্যাকাণ্ড বলেও মত দেন সাভার প্রেস ক্লাবের বর্তমান এই সভাপতি।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, রানা প্লাজার জায়গায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে বহুতল ভবন ও মার্কেট নির্মাণ করে পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। আশা করছি খুব দ্রুত এই কাজের বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হবে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে সাভার বাসস্ট্যান্ডের রানা প্লাজা ভবন ধসে পড়ে। এতে ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক নিহত, দুই হাজারেরও বেশি আহত এবং ৯৯৯ জন নিখোঁজ হন। পঙ্গুত্ব বরণ করেন আরও ১ হাজার ১৬৯ শ্রমিক।