জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি/পিরোজপুরের ফিলিং স্টেশনগুলো প্রায় ক্রেতাশূন্য

বাজারে এক লাফে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। তেলের এই মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ সর্বস্তরের মানুষ। বাস, মিনিবাস, ট্রাক, রেন্টেকার, মোটরসাইকেল ও নসিমন চালকদের আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সাধারণ মানুষ বলছেন, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বারবার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) পিরোজপুর সদরের মেসার্স পিরোজপুর ফিলিং স্টেশন ও মেসার্স বলেশ্বর ফিলিং স্টেশনে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, তেলের দাম বাড়ায় ফিলিং স্টেশনগুলো প্রায় ক্রেতাশূন্য। ধীরগতিতে চলছে কেন্দ্রগুলোর বিকিকিনি ও অন্যান্য কার্যক্রম। তেল নিতে এসে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিরোজপুর জেলার অন্য তিনটি ফিলিং স্টেশন- নাজিরপুরের মেসার্স রাবেয়া ফিলিং স্টেশন ও মেসার্স মোহনা ফিলিং স্টেশন এবং মঠবাড়িয়ার মেসার্স হাওলাদার ফিলিং স্টেশনেও ক্রেতার উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
এর আগে, গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা ওই দিন রাত ১২টা থেকেই কার্যকর হয়। এরপর থেকে চরম উৎকণ্ঠা ও হতাশায় দিন পার করছেন নানা পেশার মানুষ।
জ্বালানি তেলের নতুন দাম অনুযায়ী, প্রতি লিটার অকটেন পূর্বে ১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সদর উপজেলার মুক্তারকাঠী এলাকার বাসিন্দা ও নসিমন চালক শাওন ইসলাম শামীম বলেন, এক বছরে যদি তেলের দাম লিটারে ৫০ টাকা বাড়ে, তবে আমরা গরিব মানুষ যাব কই? বাইরে থেকে খুচরা কিনতে গেলে অতিরিক্ত টাকা চায়। আমাদের দাবি, তেলের দাম বাড়লেও যাত্রীরা তো বেশি ভাড়া দেয় না। তাই আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যাতে তেলের দাম কমানো হয়, যেন আমরা এই লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারি।
হরিণা গাজিপুরের বাসিন্দা ও মোটরসাইকেল চালক মো. রুহুল আমিন বলেন, গত ছয় মাসেই তেলের দাম লিটারে প্রায় ৪০ টাকা বেড়েছে। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় পরিবার নিয়ে চলতে কষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে তো তেলের দাম অনেক বেশি ৩-৪ দিন আগে পেট্রোল ছিল ১৪০ টাকা, আর এখন ১৬০ টাকা। বাইরে দোকানে খুচরা কিনতে গেলে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা নেয়। এত দামে তেল কেনা দুঃসাধ্য। তাই তেল কম নিচ্ছি এবং যাতায়াতও কমিয়ে দিয়েছি।
মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ও মিনি ট্রাকচালক মো. রেজাউল খান বলেন, তেলের দাম বাড়লেও গাড়ির ভাড়া বাড়েনি। বর্তমানে প্রতি ট্রিপে ৪-৫ হাজার টাকা ঘাটতি হচ্ছে, পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আগে ট্রিপ দিলে হেলপার ও ড্রাইভারের ৩ হাজার টাকা করে থাকত, এখন ২ হাজার টাকাও থাকছে না। সরকারের কাছে দাবি, তেলের দাম যেন নিয়ন্ত্রণে আনে অথবা আমাদের গাড়ির ভাড়া বাড়ানোর ব্যবস্থা করে।
আব্দুল আহাদ নামে আরেক মোটরসাইকেলচালক বলেন, তেলের দাম বাড়ানোয় আমাদের বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে। একবারে ২০ টাকা বাড়ানো ঠিক হয়নি, ধাপে ধাপে বাড়ালে এত প্রভাব পড়ত না। এটা মধ্যবিত্তের ওপর একটা বাড়তি চাপ, কারণ জ্বালানি তেলের ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে।
স্থানীয় বাস চালক বিকাশ বলেন, অন্যান্য জায়গায় কিলোমিটারে ১৭ পয়সা করে ভাড়া বেড়েছে, কিন্তু পিরোজপুর বাস মালিক সমিতি থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি। বর্তমানে তেলে দৈনিক ৫০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি খরচ হচ্ছে, কিন্তু ভাড়া না বাড়ায় আয় হচ্ছে না। আমরা খুব কষ্টে আছি।
মেসার্স পিরোজপুর ফিলিং স্টেশনের সহকারী ম্যানেজার মো. শাহ আলম বলেন, আমরা ২১ সেপ্টেম্বর তেলের দাম বাড়ার আগেই তেল এনেছিলাম, এরপর আর নতুন করে তেল আনা হয়নি। আগের মতো বিক্রি নেই, গ্রাহকও অনেক কম। স্বাভাবিক সময়ে এই সময়ের মধ্যে আমরা আরও তিন গাড়ি তেল আনতাম, কিন্তু তিন দিন পার হয়ে গেলেও নতুন তেল আনার প্রয়োজন হয়নি।
তিনি আরও জানান, হঠাৎ করে লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় অনেকে গাড়ি চালানো কমিয়ে দিয়েছেন, ফলে তেলের চাহিদাও কমে গেছে।
মেসার্স বলেশ্বর ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার শান্ত মজুমদার বলেন, দাম বাড়ার পর থেকে আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। বর্তমানে বিক্রি কিছুটা কম। তবে সার্বিক প্রভাব বুঝতে আরও দুই-চার দিন সময় লাগবে।
পিরোজপুর জেলা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসানুল কবির বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে সবজির দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন অতিরিক্ত দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করতে না পারে, সে জন্য আমরা বাজার মনিটরিং করছি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।
