logo

গারো পাহাড়ে কমছে ঔষধি গাছ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

গারো পাহাড়ে কমছে ঔষধি গাছ, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

জামালপুর ও শেরপুর সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে দেশীয় ও ঔষধি গাছের সংখ্যা। একসময় এসব মহামূল্যবান গাছ স্থানীয়দের জীবনে আশীর্বাদের মতো ছিল। পাহাড়জুড়ে ছিল প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ উপস্থিতি। কিন্তু বৃক্ষসংখ্যা কমে যাওয়ায় জলবায়ু ও বন্য প্রাণীর ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। বন বিভাগ বলছে, গত পাঁচ বছর ধরে পুনর্বনায়নের মাধ্যমে পাহাড়কে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

জামালপুরের বকশীগঞ্জ থেকে শেরপুরের ঝিনাইগাতী হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত এ পাহাড়ি অঞ্চল দেশের অন্যতম সমান্তরাল বনভূমি। এর মধ্যে জামালপুর ও শেরপুর জেলার ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমি বালিজুরী রেঞ্জের আওতায় রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই অঞ্চল জীববৈচিত্র্য ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই দশক আগেও পাহাড়ে বহেড়া, হরীতকী, আমলকী, অর্জুন, নিম, অশ্বগন্ধা ও হরিদ্রাসহ নানা প্রজাতির ঔষধি গাছ সহজেই পাওয়া যেত। কিন্তু নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, পাহাড় দখল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন এসব গাছ বিলুপ্তির পথে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ।

বকশীগঞ্জ উপজেলার দিঘলাকোনা গ্রামের বাসিন্দা জয় দাংগো বলেন, ১০-২০ বছর আগেও প্রচুর ঔষধি গাছ পাওয়া যেত। এখন সেগুলো আর চোখে পড়ে না। প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

একই এলাকার রাত্রি দারিং বলেন, আগে সাধারণ অসুখে মা-বাবারা পাহাড়ি গাছের শেকড়-ডালপালা এনে ওষুধ বানিয়ে খাওয়াতেন। এখন সেই গাছই নেই। সামান্য ঠান্ডা লাগলেই ডাক্তারের কাছে যেতে হয়।

বৈষ্ণবপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ভান্ডারি জানান, গাছপালা কমে যাওয়ায় বন্য প্রাণীর সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। আগে পাহাড়ে অনেক জীবজন্তু ছিল। এখন তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও আমরা টের পাচ্ছি-খরা বাড়ছে, বৃষ্টি কমছে, নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়তে হচ্ছে।

জামালপুর জেলা বন ও পরিবেশ কমিটির সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, পাহাড় দখল, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও পাথর উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ডে পাহাড় আজ গাছশূন্য হয়ে পড়ছে। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, ফলনও কমে এসেছে।

পরিবেশবিদেরা বলছেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে বৃষ্টিপাত কমছে, পাহাড়ি ভূমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। এর প্রভাবেও গাছের সংখ্যা কমছে।

জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রোকোনুজ্জামান বলেন, গাছ কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসছে। মাটির গুণাগুণ ও উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। যে পরিবেশে যে উদ্ভিদের জন্ম নেওয়ার কথা, সেখানে তা আর জন্মাতে পারছে না। ফলে উদ্ভিদ ও বন্য প্রাণী উভয়ই তাদের স্বাভাবিক আবাস হারাচ্ছে।

তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে বন বিভাগ। ময়মনসিংহ বিভাগের বালিজুরী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া জানান, গত পাঁচ বছরে বালিজুরী রেঞ্জের আওতায় ১ হাজার ২৫৫ হেক্টর জমিতে ১৬ প্রজাতির প্রায় ৩০ লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বহেড়া, হরীতকী, আমলকী, অর্জুন ও নিম উল্লেখযোগ্য।

তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ ও পরিপক্ব বন গড়ে উঠতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগবে। সে লক্ষ্যেই আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।