জনরোষে ওলটপালট জামালপুরে গণপরিবহনের চিত্র

মাত্র ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে জামালপুরে ঘটে গেছে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যু, ক্ষুব্ধ জনতার বিক্ষোভ, বাস ভাঙচুর, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং শেষ পর্যন্ত বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা–সব মিলিয়ে নজিরবিহীন পরিবহন সংকটের মুখে পড়েছে জামালপুর জেলা।
একদিকে রাজীব পরিবহনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিবাদে কর্মবিরতিতে নেমেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
ঘটনার সুত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত গত ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায়। জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের লাহিড়ীকান্দা ঈদগাহ মাঠ এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে একটি ইজিবাইকের ওপর পড়ে যায়।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হয়। আহত হন অন্তত ১৫ জন।
দুর্ঘটনার পর পুরো জেলায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই পরিবহনটির বেপরোয়া চলাচলকে দায়ী করেন।
এর আগে গত ২২ জুলাই সদর উপজেলার নান্দিনা মুদিপাড়া এলাকায় রাজীব পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত হন।
এ ছাড়া গত কয়েক মাসে ছোট-বড় মিলিয়ে একাধিক দুর্ঘটনায় রাজীব পরিবহনের নাম এসেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এসব ঘটনায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। কয়েকটি ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা বাসে আগুন ও ভাঙচুরও চালিয়েছিল।
জনরোষ থেকে বিক্ষোভ-ভাঙচুর
লাহিড়ীকান্দার দুর্ঘটনার পর থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানে আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজীব পরিবহনের বিরুদ্ধে অসংখ্য পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে পরিবহনটির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। কেউ কেউ এই রুটে বিকল্প পরিবহন চালুর দাবিও তোলেন।
জামালপুর শহরের বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার খবর শুনছি। মানুষ মারা যাচ্ছে। তারপরও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন দেখছি না। রাস্তায় রাজিব বাস একদম বেপোরোয়া ভাবে চলে। এখন আমাদের সাধারণ মানুষের স্বার্থে, নিরাপত্তার স্বার্থে বিকল্প ব্যবস্থা দরকার।
পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় ২ সেপ্টেম্বর সকালে।জামালপুর সদর উপজেলার নান্দিনা বাজার এলাকায় স্থানীয় ছাত্র-জনতার ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, একের পর এক দুর্ঘটনার পরও রাজীব পরিবহনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
একপর্যায়ে উত্তেজিত জনতা যাত্রী নামিয়ে রাজীব পরিবহনের জামালপুরগামী ও ঢাকাগামী দুটি বাসে ভাঙচুর চালায়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, এ সময় চালক ও হেলপারদের মারধর করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র শক্তি আহ্বায়ক আমিমুল ইহসান ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে ২ সেপ্টেম্বর রাতে নিরাপদ সড়কের দাবিতে মানববন্ধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
ক্ষুদে বার্তায় বলা হয়, রাজীব পরিবহনের বেপরোয়া চলাচল বন্ধ, বাস সার্ভিসের মানোন্নয়ন, যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ রুটে কঠোর তদারকির দাবিতে ৩ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টায় জামালপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হবে।
ঘোষণায় জেলার সচেতন নাগরিক, শিক্ষার্থী ও তরুণদের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
কর্মবিরতি-দুর্ভোগ
বুধবার সকালের ঘটনার পর পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। রাতে জামালপুর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে সংবাদ সম্মেলন করে জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়ন কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়।
রাজীব পরিবহনের চালক মিলন আহমেদ বলেন, বাস ভাঙচুর ও শ্রমিকদের মারধরের ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত গাড়ি চালানো সম্ভব নয়।
কর্মবিরতির ঘোষণার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে। জামালপুর-ঢাকা রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন হাজারো যাত্রী। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
অনেকে বিকল্প যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার অনেককে যাত্রা বাতিল করতেও দেখা গেছে।
টার্মিনালে এসে ঢাকাগামী যাত্রী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, জরুরি কাজে ঢাকায় যাওয়ার জন্য ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়েছি। টার্মিনালে এসে জানতে পারলাম বাস চলবে না। এখন কীভাবে যাব বুঝতে পারছি না। কোনো আগাম ঘোষণাও পাইনি। যদি আগে থেকেই বলা হতো তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা যাওয়ার ব্যবস্থা করতাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যকর নজরদারি কিংবা দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অন্যদিকে শ্রমিকরা বলছেন, তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে একটি দুর্ঘটনা থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ এখন রূপ নিয়েছে বৃহত্তর পরিবহন সংকটে।
জামালপুর বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ বলেন, জামালপুরগামী ও ঢাকাগামী দুটি রাজীব পরিবহনের বাসে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় চালক ও সহকারীদের মারধর করে এবং টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিষয়টি পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে তারা কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেন। চালক-শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাস চলাচল বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি বাসে ভাঙচুর ও শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব বলেন, বাস শ্রমিকদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



