logo
পিরোজপুরে ট্রলারডুবি

মেয়েকে হারিয়ে বাবার আহাজারি, স্ত্রী এখনও নিখোঁজ

মেয়েকে হারিয়ে বাবার আহাজারি, স্ত্রী এখনও নিখোঁজ
ট্রলার ডুবেতে হারিয়েছেন মেয়েকে, স্ত্রী এখনও নিখোঁজ। শংকর বেপারী ও তার স্বজনদের আহাজারি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দুর্গাপূজার আনন্দ নিমেষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে শংকর বেপারীর পরিবারে। দুর্গাপূজা শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে অতিরিক্ত যাত্রী ও মোটরসাইকেল বোঝাই একটি ট্রলার ডুবে মা ও মেয়ে নিখোঁজ হন। উদ্ধার অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পর মেয়ে অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা গেলেও এখনও উদ্ধার করা যায়নি মা রিনা বেপারীকে।

মেয়েকে হারিয়ে আহাজারি করতে করতে অর্পিতার বাবা শংকর বেপারী বলেন, ‘গত রাতেও মেয়ে আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছে, আজ সে স্মৃতি। আমি কীভাবে রাতগুলো পার করব? নৌকাডুবির পর যখন আমার পরিবারের কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তখন হাসপাতালসহ আশপাশের নদীতে খুঁজেছি। সবাই তীরে উঠলেও ওরা নিখোঁজ রয়ে যায়। এখন মেয়ে মারা গেছে, ওর মাও হয়তো বেঁচে নেই।’

সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীরামকাঠী-ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকার কালীগঙ্গা নদীতে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। প্রায় ৫০ জনের বেশি যাত্রী ও ৬ থেকে ৮টি ভারী মোটরসাইকেল নিয়ে একটি ট্রলার ডুবে যায়। এ সময় অন্যরা তীরে উঠতে পারলেও অর্পিতা ও রিনা বেপারী উঠতে পারেননি।

খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রথম দফায় উদ্ধার অভিযান চালান। তবে তখন কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল এনে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় নিখোঁজ শিশু অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তার মা রিনা বেপারী।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাত ১০টা ১৩ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ২৬ ঘণ্টা পার হলেও রিনা বেপারীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ফায়ার ফাইটার মো. পারভেজ।

নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠী গ্রামের শংকর বেপারীর স্ত্রী রিনা বেপারীর বয়স ৩৯ বছর। তাদের একমাত্র মেয়ে অর্পিতার বয়স ছিল ৮ বছর। শংকর বেপারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করেন। দুর্গোৎসবের ছুটিতে তিনি পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। সোমবার রাতে শ্রীরামকাঠীতে প্রতিমা দর্শন ও পূজা দেখে আনন্দে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রলারে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে পথেই প্রাণ হারায় ছোট্ট অর্পিতা।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ট্রলার থেকে বেঁচে ফেরা এক যাত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, নাজিরপুর প্রান্ত থেকে ভরতকাঠী ফেরিঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসার সময় ট্রলারটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী এবং অন্তত আটটি ভারী মোটরসাইকেল তোলা হয়েছিল। অতিরিক্ত বোঝার কারণে ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং ঘাট ছাড়ার পরপরই নদীতে তলিয়ে যায়। চারদিকে শুরু হয় বাঁচার আকুতি ও হাহাকার। অধিকাংশ মানুষ সাঁতরে ও স্থানীয়দের সহায়তায় তীরে উঠতে পারলেও অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে যান রিনা বেপারী ও তার ছোট্ট মেয়ে অর্পিতা।

দুর্ঘটনাস্থল ও উদ্ধার পরিস্থিতি তদারকি করতে দ্রুত সেখানে ছুটে যান নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আহসান হাবিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন জাহান। উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রয়েছেন পিরোজপুর জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক রায়হানুল আশরাফ এবং নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক সোয়াইব হোসেন মুন্সি। এ ছাড়া নাজিরপুর ও নেছারাবাদ থানা-পুলিশের একটি যৌথ দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা জানান, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তীব্র পানির স্রোতের মধ্যেও দুই দফায় অভিযান চালিয়ে শিশু অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এ ঘটনায় যাদের অবহেলা ছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল শ্রীরামকাঠী ও নেছারাবাদের ভরতকাঠী খেয়াঘাট এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মনজুর। পরিদর্শনকালে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. গোলাম রাব্বানী ও পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।