logo

সংস্কারের অভাবে জৌলুস হারাচ্ছে ৩৬৭ বছরের বিবিচিনি শাহী মসজিদ

সংস্কারের অভাবে জৌলুস হারাচ্ছে ৩৬৭ বছরের বিবিচিনি শাহী মসজিদ
বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি শাহী মসজিদ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

মুঘল আমলের ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি শাহী মসজিদ। প্রায় ৩৬৭ বছরের পুরনো এই মসজিদ ঘিরে রয়েছে নানা ইতিহাস ও লোককথা। তবে যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনার বিভিন্ন স্থানে পড়েছে অযত্ন-অবহেলার ছাপ। দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এলেও তাদের জন্য নেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। মসজিদ সংরক্ষণের পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।

বরগুনার বেতাগী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বিবিচিনি ইউনিয়নে মসজিদটি অবস্থিত। সবুজে ঘেরা উঁচু টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক গম্বুজবিশিষ্ট এই স্থাপনা মুঘল আমলের স্থাপত্যরীতির পরিচয় বহন করছে। ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি মসজিদটির নির্মাণশৈলীও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে পারস্য থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে উপমহাদেশে আসেন শাহ নেয়ামতুল্লাহ। তৎকালীন বাংলার সুবেদার শাহ সুজার অনুরোধে তিনি বিষখালী নদীপথে এসে বিবিচিনি এলাকায় মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, জিন-পরীরা রাতারাতি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এ বিশ্বাস থেকে স্থানীয়দের কাছে এটি ‘পরীর মসজিদ’ নামেও পরিচিত।

সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু টিলার ওপর অবস্থিত মসজিদটির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৪০ ফুট করে। চারপাশের দেয়াল ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি পুরু। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে খিলানাকৃতির প্রবেশদ্বার। মসজিদটির ইট ধূসর রঙের এবং আকৃতিতে বর্তমান সময়ের ইটের চেয়ে আলাদা। দর্শনার্থী ও মুসল্লিদের ওঠানামার জন্য দক্ষিণ-পূর্ব পাশে রয়েছে সিঁড়ি।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির বিভিন্ন অংশে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা দেয়। দেয়ালের কিছু অংশের পলেস্তারা খসে পড়লে ১৯৮৫ সালে বেতাগী উপজেলা পরিষদের অর্থায়নে তা মেরামত করা হয়। পরে ১৯৯২ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের দায়িত্ব নেয় এবং এটিকে ঐতিহাসিক নিদর্শনের তালিকাভুক্ত করে।

মসজিদটি দেখতে বরিশাল থেকে এসেছেন মো. হিরা। ঐতিহাসিক এই স্থাপনা দেখে ভালো লাগলেও দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় কিছুটা হতাশ তিনি। মো. হিরা বলেন, মসজিদটির কথা অনেক আগে থেকেই শুনেছেন; তাই দূর থেকে এটি দেখতে এসেছেন। জায়গাটি তার ভালো লেগেছে। তবে আশপাশে খাবারের দোকান না থাকায় দর্শনার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পর্যটকদের সুবিধার জন্য এখানে খাবারের দোকানসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকা উচিত।

আরেকজন দর্শনার্থী জাফর হোসেন চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকলেও তার বাড়ি বাকেরগঞ্জে। তার মতে, যথাযথ প্রচার-প্রচারণার অভাবে বিবিচিনি শাহী মসজিদের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনা অনেকের কাছেই অপরিচিত রয়ে গেছে। তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে প্রচার করা হলে মসজিদটি একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এর ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

এলাকাবাসী ও দর্শনার্থীদের প্রত্যাশা, মসজিদটির ঐতিহাসিক স্থাপত্য ঠিক রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হলে এটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, ঐতিহাসিক এই স্থাপনা ঘিরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে মসজিদটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন।