বলের ভারসম্যে চারবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ফুটবল জাদুকর হালিমের

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই গতি, উত্তেজনা আর কোটি কোটি মানুষের আবেগের বিস্ফোরণ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এখন বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত। শহর থেকে গ্রাম, হাট-বাজার থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সবখানেই চলছে প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, বিশ্লেষণ আর উচ্ছ্বাস। কোথাও আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ছে, কোথাও ব্রাজিলের, কেউ সমর্থন করছেন ফ্রান্সকে, কেউবা স্পেন, জার্মানি কিংবা পর্তুগালকে।
বিশ্বকাপের এই গতিময় ফুটবল উন্মাদনার মধ্যেই ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে দেখা মিলল ফুটবলের এক ভিন্ন শিল্পরূপের। মাঠে গোল কিংবা গতির খেলা নয়, বরং স্থির বলের জাদু দেখিয়ে শিক্ষার্থী ও দর্শকদের মুগ্ধ করলেন দেশের অন্যতম ক্রীড়া বিস্ময়, চারবারের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী আব্দুল হালিম।
মাগুরার শালিখা উপজেলার ছয়ঘরিয়া গ্রামের এই ক্রীড়াবিদ বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন ফুটবল নিয়ন্ত্রণের অনন্য দক্ষতায়। মাথায় বল রেখে দীর্ঘ সময় সাইকেল চালানো এবং বলের ভারসাম্য রক্ষার নানা কৌশলে তিনি একাধিকবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান করে নিয়েছেন।
গত ১১ জুন কালীগঞ্জ উপজেলার কোলা বাজার ইউনাইটেড হাইস্কুল মাঠে টিফিন বিরতির সময় শিক্ষার্থীদের সামনে তিনি ফুটবল নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ সব কৌশল প্রদর্শন করেন। কখনও মাথার ওপর বল রেখে পুরো মাঠজুড়ে ছুটে বেড়ান, কখনও একটি বল মাথায় রেখে, আরেকটি বল পায়ে নিয়ন্ত্রণ করেন। আবার দুটি ফুটবলের ওপর দাঁড়িয়ে মাথায় একটি বল এবং দুই হাতে কাঠির সাহায্যে আরও দুটি বল ঘুরিয়ে দেখান বিস্ময়কর ভারসাম্য।

এতেই শেষ নয়। কখনও মাটিতে শুয়ে মাথা, কপাল কিংবা নাকের ওপর বল স্থির রাখেন, কখনও মাথায় বল রেখে বাইসাইকেল চালান। এমনকি চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসেও মাথার ওপর ফুটবল রেখে ভারসাম্য বজায় রাখেন। তার প্রতিটি প্রদর্শনীতে বিস্মিত হয়ে ওঠে উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শকরা। করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মাঠ।
জানা গেছে, চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মাগুরা ইনডোর স্টেডিয়ামে মাথায় ফুটবল রেখে টানা দুই ঘণ্টা ১৯ মিনিট সাইকেল চালিয়ে নিজের আগের রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েন আব্দুল হালিম। এর আগে ২০১৭ সালের ৮ জুন ঢাকায় মাথায় বল রেখে ১৩ দশমিক ৭৪ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছিলেন তিনি।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে আব্দুল হালিমের প্রথম নাম ওঠে ২০১১ সালের ২২ অক্টোবর। ওই বছর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে মাথায় ফুটবল রেখে ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ হেঁটে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। পরে ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর কমলাপুর রেলস্টেশনে রোলার স্কেটিংয়ের মাধ্যমে ২৭ দশমিক ৬৬ সেকেন্ডে ১০০ মিটার অতিক্রম করে আবারও গিনেস বুকে নাম লেখান।
কোলা বাজার ইউনাইটেড হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক তরুণ কান্তি বিশ্বাস বলেন, আব্দুল হালিমের প্রদর্শনী সত্যিই বিস্ময়কর। মাথা, কপাল, ঘাড় কিংবা নাকের ওপর যেভাবে তিনি বল নিয়ন্ত্রণ করেন, তা দেখে অভিভূত হতে হয়। তার জীবন আমাদের শেখায়, অধ্যবসায় ও সাধনা থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
নিজের সাফল্যের গল্প বলতে গিয়ে আব্দুল হালিম বলেন, স্কুলজীবনে আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় খেলতেন তিনি। একবার একজন গোলরক্ষককে প্রায় ৩০ সেকেন্ড বল মাথার ওপর ভারসাম্য রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অনুপ্রাণিত হন। এরপর শুরু হয় নিরলস অনুশীলন।
তিনি বলেন, আজ প্রায় ৩৩ বছর ধরে ফুটবলই আমার সঙ্গী। এই বলই আমাকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেছে। চারবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখাতে পেরেছি, যা দেশের জন্যও গর্বের।

তবে সাফল্যের আড়ালে রয়েছে জীবনের কঠিন বাস্তবতা। বর্তমানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া আয়োজনে ফুটবল প্রদর্শনী করে পাওয়া সম্মানী দিয়েই চার সদস্যের পরিবারের খরচ চালান আব্দুল হালিম। ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও আছে তার।
আব্দুল হালিম বলেন, সারা জীবন বলকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বয়স বাড়ছে। একসময় হয়তো শরীর আর আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। তখন পরিবার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তা প্রায়ই আমাকে ভাবিয়ে তোলে।
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় যখন গোটা বিশ্ব গতির ফুটবলে মগ্ন, তখন আব্দুল হালিম যেন মনে করিয়ে দিলেন, ফুটবল শুধু গোল আর জয়ের গল্প নয়, এটি অধ্যবসায়, শিল্প, ভারসাম্য ও আত্মনিবেদনেরও এক অনন্য প্রতীক। আর সেই শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে বারবার তুলে ধরেছেন এই নিরলস সাধক।



