১২ দরজার রহস্যময় বারো দুয়ারী মসজিদ

শেরপুরের শ্রীবরদী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক গড় জরিপা বারো দুয়ারী মসজিদ এখন শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক কাহিনির কারণে বহু মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। জনশ্রুতি আছে, স্বপ্নের নির্দেশনায় খুঁজে পাওয়া এই মসজিদটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মুসলিম স্থাপত্যকলার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
স্থানীয়ভাবে পরিচিত গড় জরিপা বারো দুয়ারী মসজিদ এ রয়েছে ১২টি দরজা। এ কারণেই এর নাম হয়েছে বারো দুয়ারী মসজিদ। মসজিদটিতে তিনটি জানালা ও তিনটি গম্বুজ রয়েছে।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় সাতশ বছর আগে জরিপ শাহ নামের এক সাধক মসজিদটি নির্মাণ করেন। মোগল আমলে এটি একটি সেনাছাউনির মসজিদ হিসেবেও পরিচিত ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। সময়ের প্রবাহে ভূমিকম্পে মসজিদটি ধ্বংস হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। ধীরে ধীরে সেখানে মাটির স্তূপ জমে টিলা তৈরি হয় এবং চারপাশে গজিয়ে ওঠে ঘন জঙ্গল। এলাকাবাসীর মুখে জায়গাটি পরিচিত ছিল ‘মজিদের আড়া’ নামে। পরে ছারছিনা দরবারের এক খলিফা আজিজুল হক শ্রীবরদীতে আসেন। কথিত আছে, তিনি স্বপ্নে এই মসজিদের অবস্থান সম্পর্কে আধ্যাত্মিক ইশারা পান। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি স্থানীয়দের সহযোগিতায় টিলাটি পরিষ্কার ও খনন শুরু করেন। কয়েক গজ মাটি খননের পর সেখানে একটি প্রাচীন মসজিদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মসজিদের ইটগুলোতে গোলাপ ফুলের নকশা খোদাই করা ছিল।
শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এখানে নামাজ পড়তে এসেছেন। অনেকেই মান্নত করে দানবাক্সে টাকা দিচ্ছেন। মসজিদের সামনে স্কুল মাঠে সারি করে রাখা মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা দর্শনার্থীর উপস্থিতির জানান দিচ্ছিল।
শেরপুর শহর থেকে আসা মো. নাহিদ বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে এখানে জুমার নামাজ পড়তে এসেছি। অনেক দিন ধরে স্বপ্নে পাওয়া এই মসজিদে নামাজ পড়ার ইচ্ছা ছিল।’ নকলা থেকে আসা রিমন মিয়া বলেন, ‘অনেক দিন ধরে শুনছিলাম মসজিদটির কথা। তাই ভাগিনাকে নিয়ে এখানে নামাজ পড়তে এসেছি।’
স্থানীয়দের মতে, ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কারণে বারো দুয়ারী মসজিদটি ভবিষ্যতে পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মসজিদের খতিব মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, প্রাচীন মসজিদের গোলাপফুল খোদাইকৃত ইটগুলো ১৯৬৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই মসজিদটিতে আবার নিয়মিত নামাজ আদায় শুরু হয়। তিনি জানান, পরে কয়েক দফা সংস্কার ও সম্প্রসারণের ফলে মসজিদটি বর্তমান রূপ পেয়েছে। নতুন নির্মাণেও পুরোনো ঐতিহ্যের স্মৃতি ধরে রাখতে ১২টি দরজা রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে মসজিদ কমিটির সভাপতি ওসমান গনি জানান, বর্তমানে মসজিদটিতে তিন তলা পর্যন্ত নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্তে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন মুসল্লি নামাজ পড়েন। তবে শুক্রবার জুমার দিনে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মুসল্লির সমাগম হয়।
তিনি আরও বলেন, মসজিদের উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। স্থানীয়দের দান-অনুদানেই মসজিদের উন্নয়নকাজ চলছে।