logo
Advertisement

সরকারি দামে সার মিলছে না চাঁপাইনবাবগঞ্জে, বিপাকে আমন চাষিরা

মেহেদী হাসান সিয়াম,চাঁপাইনবাবগঞ্জ
সরকারি দামে সার মিলছে না চাঁপাইনবাবগঞ্জে, বিপাকে আমন চাষিরা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমন খেতে কাজ করছেন এক কৃষক। ছবি : এশিয়া পোস্ট

রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে বীজ রোপণের কাজ শেষ করার পর এখন ধানক্ষেত নিড়ানো, পরিচর্যা ও সার প্রয়োগের চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমন চাষিরা। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চাহিদা অনুযায়ী সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। ডিলারের দোকানে ঘুরলেও সার মিলছে না, অথচ খুচরা দোকানে চড়া দামে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে।

Advertisement

সরকারি নথিপত্র ও মনিটরিং কমিটির কাগজে-কলমে সারের কোনো ঘাটতি না দেখালেও মাঠের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বাধ্য হয়ে চড়া দামে সার কিনতে গিয়ে উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার প্রান্তিক কৃষকেরা।

কৃষকদের অভিযোগ, তদারকির দায়িত্বে থাকা মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু কৃষি কর্মকর্তা, নিবন্ধিত ডিলার ও অবৈধ খুচরা সার বিক্রেতাদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট সারের বিতরণ, বিক্রি ও দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের কাছ থেকে সরকারি মূল্যে সার না পেয়ে খালি হাতে বাড়ি ফেরার উপায় না থাকায় প্রান্তিক চাষিরা চড়া দামেই সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ৫০ কেজির এক বস্তা সার কিনতে স্থানভেদে কৃষককে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। সরকারি নির্ধারিত দাম তোয়াক্কা না করে খুচরা দোকানে ১৬০০ থেকে ১৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে ডিএপি সার। অথচ প্রতি মাসে জেলা ও উপজেলা সার এবং বীজ মনিটরিং কমিটির বৈঠকে দেখানো হচ্ছে সারের কোনো সংকট নেই এবং দামও বাড়েনি।

সরেজমিনে কথা হয় মহাডাঙ্গা এলাকার কৃষক তরিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে তিনি ২১ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। এই জমির জন্য প্রথম দফাতেই অন্তত ৮ থেকে ১০ বস্তা সারের প্রয়োজন। কিন্তু ডিলারের কাছে গিয়ে সার পাওয়া যাচ্ছে না। বহু চেষ্টা চালিয়ে তিনি মাত্র ৫ বস্তা সার সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকারি গোডাউন থেকে সার উত্তোলন করা হলেও ডিলাররা অসাধু উপায়ে সার মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং বেশি দামে বিক্রি করছে।

একই অভিযোগ চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বিদিরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমানের। তিনি জানান, ১২ বিঘা জমিতে ধান চাষ করে প্রয়োজনের সময় সরকারি মূল্যে সার পাচ্ছেন না। খুচরা দোকান থেকে বাড়তি দামে সার কিনে জমি বাঁচাতে গিয়ে তাদের খরচের হিসাব মিলছে না। দ্রুত সরকারি সরবরাহের স্বাভাবিকতা না ফিরলে আমন ধান উৎপাদনে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫টি উপজেলায় আমন আবাদের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি, যার ইতোমধ্যে ৯৮ শতাংশ জমিতে রোপণ শেষ হয়েছে। চলতি আগস্ট মাসে জেলায় ১০ হাজার ৫৯০ টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ হাজার ৩৯০ টন, টিএসপি ১ হাজার ২৯৫ টন, ডিএপি ২ হাজার ৯৩৫ টন এবং এমওপি ১ হাজার ৯৭০ টন, যা বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া পরবর্তী চাহিদা মোকাবিলায় ইতোমধ্যে সেপ্টেম্বর মাসের জন্যও নতুন বরাদ্দ চলে এসেছে। সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বরাদ্দকৃত সারের মধ্যে রয়েছে এমওপি ১ হাজার ৭৪০ টন, ডিএপি ৩ হাজার ৪২০ টন এবং টিএসপি ৮৯০ টন।

এদিকে অবৈধ সার মজুত ও চড়া দামে বিক্রির খবর পেয়ে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি ও সার অবৈধভাবে মজুত করার অপরাধে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, নাচোল ও গোমস্তাপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট সদর উপজেলায় এক খুচরা সার বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া ১৭ আগস্ট গোমস্তাপুরে ৩০ হাজার টাকা এবং ১৮ আগস্ট নাচোলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে অসাধু চক্রের কাছ থেকে জব্দ করা সার পরবর্তীতে সরকারি নির্ধারিত মূল্যে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে বিতরণ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা।

তবে সারের সংকটের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মো. আতিকুল ইসলাম। তিনি জানান, জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই। মূল সমস্যা হচ্ছে টিএসপি ও ডিএপি সারের অতিরিক্ত চাহিদা। চাষিরা জমিতে সুষম মাত্রা না মেনে এক বিঘা জমিতে ১০-১৫ কেজি ডিএপি সারের পরিবর্তে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি সার ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি অনেকে অন্য ফসলের জন্য আগেভাগেই সার কিনে মজুত রাখছেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি কৃষকদের জমিতে পরিমিত সার, জৈব সার ও উন্নত পদ্ধতি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

অন্যদিকে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী জানান, সরকার থেকে যে সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তার শতভাগই উত্তোলন করে বাজারে পাঠানো হয়েছে। তবে জেলায় আম চাষ এবং দেরিতে হওয়া বিভিন্ন ফসলের অতিরিক্ত চাহিদার কারণে কিছু কিছু জায়গায় সারের বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং অসাধু সিন্ডিকেটের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে প্রশাসনের কঠোর মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।