logo

ঈদের ছুটিতে ফরিদপুরে দুই নারীসহ তিন খুন

ঈদের ছুটিতে ফরিদপুরে দুই নারীসহ তিন খুন
ছবি: এশিয়া পোস্ট

পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে ফরিদপুরে বেড়েছে সহিংসতা। পারিবারিক সহিংসতা ও জমি নিয়ে বিরোধে পৃথক তিন ঘটনায় দুই নারীসহ তিনজন খুন হয়েছেন। এ ছাড়া তুচ্ছ ঘটনায় বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।

গত ২৭ মে সকাল থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সালথা ও সদরপুর উপজেলায় এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

চাচাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চর চাঁদপুর গ্রামে শুক্রবার সন্ধ্যায় বসতবাড়ির গাছ কাটা নিয়ে সিরাজুল ইসলাম নামের ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ভাতিজাদের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় মাসুদ রানা (৪০) নামের একজনকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে।

জানা গেছে, নিহত কাজী সিরাজুল ইসলাম (৫৭) মানিকগঞ্জে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। শুক্রবার বিকেলে তিনি কর্মস্থল থেকে বাড়ি যান বোনদের কোরবানির মাংস দেওয়ার জন্য। বাড়িতে পৌঁছানোর পর দেখতে পান, কয়েকটি গাছ কাটা হয়েছে। পরে ভাতিজা সুমনের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে ভাতিজা সুমন সদুত্তর দিতে না পারায় চাচা সিরাজুলের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে সুমন (৪০) ও তুষার (৩২) দুই ভাই চাচা সিরাজুলকে হাতুড়ি ও কাঠের বাটাম দিয়ে বেদম মারধর করেন। এ সময় অপর ভাতিজা মাসুদ রানা (৪০) ঠেকাতে গেলে তাকেও কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে পরিবারের অন্য সদস্যরা গুরুতর আহত সিরাজুলকে শহরের হার্ট ফাউন্ডেশনে নেন। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আল মামুন শাহ বলেন, নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা থানায় কোনো অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছেলের কোদালের কোপে মা নিহত

ঈদের দিন সকালে আলফাডাঙ্গায় ছেলে হাসান শেখের কোদালের কোপে ফুলজান বেগম নিহত হন। ওই দিন সকাল ৯টার দিকে উপজেলার বানা ইউনিয়নের পণ্ডিত বানা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। ফুলজান বেগম ওই গ্রামের হাফিজার শেখের স্ত্রী। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, হোসেন শেখকে (২৫) বিয়ের পরপরই তার স্ত্রী ছেড়ে চলে যান। তারপর থেকে তিনি বিভিন্ন ধরনের শ্রমিকের কাজ করেন এবং একাকী জীবনযাপন করে আসছিলেন। ঘটনার দিন সকালে হোসেন শেখের ঘরের সামনে তার মা ফুলজান বেগম ফুলগাছের চারা রোপণ করতে যান। এ নিয়ে মা-ছেলের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হোসেন শেখ কোদাল দিয়ে তার মা ফুলজান বেগমের মাথায় কোপ দেয়। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

আলফাডাঙ্গা থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) ফকির তাইজুর রহমান বলেন, ঘটনার পর অভিযুক্ত ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জমি নিয়ে বিরোধে পিটিয়ে হত্যা

ঈদের আগের দিন বোয়ালমারীতে জমি নিয়ে বিরোধে ফিরোজা বেগমকে (৭১) পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার চতুল ইউনিয়নের বনচাকী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ফিরোজা বেগম ওই গ্রামের ওজেদ মোল্যার মেয়ে ও মৃত মুক্তার মোল্লার স্ত্রী।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফিরোজা বেগমের সঙ্গে বাবার সম্পত্তি নিয়ে পাশের রামচন্দ্রপুর গ্রামের টুলু মিয়া ও তার পরিবারের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। ওই জমি নিয়ে আদালতে মামলার পর রায় ফিরোজা বেগমের পক্ষে হয়। তবে আদালতের রায় অমান্য করে টুলু মিয়ারা জমি দখল করে রেখেছিলেন। ওই জমিতে গত বুধবার ফিরোজা বেগম শৌচাগার নির্মাণ করতে গেলে টুলু মিয়া (৪৫), তার ভাই বাচ্চু মিয়া (৫৫), রসুল মিয়া (৭৫) ও বাচ্চু মিয়ার ছেলে বাপ্পি মিয়া (২৭) তাকে মারধর করেন। কিলঘুষি ও লাথিতে আহত হলে ফিরোজাকে বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় বোয়ালমারী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এই ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তুচ্ছ ঘটনায় সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক

এক সপ্তাহ আগে ইউপি চেয়ারম্যান সোহাগ মোল্যার বিরুদ্ধে ঈদ উপলক্ষে অসহায় ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা চাল আত্মসাতের অভিযোগ তুলে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন আকরাম শেখ নামের এক যুবক। এই ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান তার ওপর ক্ষিপ্ত হন এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই যুবকের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান ইউপি চেয়ারম্যানের ভাই চন্দন মোল্যা। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে প্রায় দুই ঘণ্টা। খবর পেয়ে ভাঙ্গা থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ভাঙ্গা থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মো. মিজানুর রহমান বলেন, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় সালথায় বসতঘরের ওপর গাছ পড়াকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের পুরুরা সাধুর পাড়া গ্রামে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্র বলেছে, ঝড়ে ওই গ্রামের মুন্নু মোল্যার একটি বড় গাছ তুহিন মোল্যার ঘরের ওপর পড়ে। পরে মুন্নু মোল্যা নিজ খরচে ঘরটি মেরামত করে দিলেও বৃষ্টির পানি পড়ে তুহিন মোল্যার সংরক্ষিত পেঁয়াজ ভিজে যায়। বিষয়টি নিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলাকালে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় দুই পক্ষ। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। আহত ব্যক্তিদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সালথা থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) বাবলুর রহমান খান বলেন, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ছাড়া ঈদের দিন (বৃহস্পতিবার) কোরবানির মাংস বণ্টনের জায়গা নির্ধারণ নিয়ে ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের পূর্ব আড়ুয়াকান্দী গ্রামে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের ৩০ জন আহত হয়।