ঝিনাইদহ সীমান্তে আফগান নাগরিকের মৃত্যু ঘিরে রহস্য

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের খবর নতুন নয়। তবে নতুন করে সামনে এনেছে যৌথ মানবপাচার চক্রের অপতৎপরতা। ঝিনাইদহ সীমান্ত এলাকা থেকে তিন দিনের ব্যবধানে দুইটি মরদেহ উদ্ধারের পর বিষয়টি সামনে আসে। এর মধ্যে প্রথম উদ্ধার হয় আফগানিস্তানের এক নাগরিকের মরদেহ। ভারতে কারাভোগ শেষে বাংলাদেশে তার মৃত্যু ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে একটি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরিচয় জানার জন্য তার আঙুলের ছাপ নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে তার কোনো তথ্য পায়নি পিবিআই। পরে ১৪ এপ্রিল ঝিনাইদহ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে মরদেহটি স্থানীয় গোরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
এর তিন দিনের মাথায় ১৬ এপ্রিল একই সীমান্তের ইছামতী নদীর কচুরিপানার নিচ থেকে রতিকান্ত জয়ধর নামে এক বাংলাদেশি নাগরিকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রতিকান্ত গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বাসিন্দা। তার পকেটে থাকা বাংলাদেশি পাসপোর্টের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। তিন দিনের ব্যবধানে একই স্থান থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয়
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে আসে–অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি আফগানিস্তানের নাগরিক। তার নাম হাশমত মোহাম্মাদি। তিনি আফগানিস্তানের নাগরিক হলেও ইতালির পাসপোর্টধারী ছিলেন। দাফনের ১১ দিন পর ২২ এপ্রিল তার ভাই মোহাম্মদ ইরা পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
হাশমতের পরিবারের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আন্তঃদেশীয় মানবপাচারকারী চক্র এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। হাশমতের কাছে থাকা অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নিতে নদীতে চুবিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটি যশোরের চৌগাছা সীমান্তে ঘটতে পারে।
মহেশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মেহেদী হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মরদেহটি উদ্ধার করে সুরতহাল প্রস্তুত করার সময় আমাদের ধারণা হয়েছিল এটি কোনো বিদেশি নাগরিকের হতে পারে। ওই নাগরিকের ভাই ও ভাবি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগটি সামনে রেখে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহেশপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) টিপু সুলতান বলেন, সুরতহাল করার সময় মরদেহে আঘাতের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, সেটা জানার জন্য ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
রোমাঞ্চকর অনুসন্ধান
মরদেহ উদ্ধারের পর হাশমত মোহাম্মাদির ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ছবিটি নজরে আসে তার ভাই মোহাম্মদ ইরার। তিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। সেখান থেকে যোগাযোগ করেন মো. আহসানের সঙ্গে। তার বাড়ি বগুড়া জেলায়। মোহাম্মদ ইরা ও মো. আহসান পূর্বপরিচিত।
আহসান ধারণা করেন, মোহাম্মদ ইরার ভাই হাশমত মোহাম্মাদি যশোরের চৌগাছা সীমান্তে হত্যার শিকার হয়েছেন। এজন্য তিনি যোগাযোগ করেন চৌগাছা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সাইদুর রহমান ইমনের সঙ্গে। এই চিকিৎসক আহসানকে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী রহিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তারা বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হন, ঝিনাইদহ সীমান্ত এলাকায় উদ্ধার হওয়া মরদেহটি মোহাম্মদ ইরার ভাই হাশমত মোহাম্মাদির।
ভারতে হাশমতের কারাভোগ
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর হাশমত মোহাম্মাদির ভাই মোহাম্মদ ইরা যোগাযোগ করেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে দেওয়া তার তথ্যমতে–হাশমত মোহাম্মাদি ইতালির পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে যাতায়াত করতেন। সেখান থেকে বিভিন্ন আংটির পাথর ও রত্ন নিয়ে এসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করতেন।
পাঁচ বছর আগে ভারতীয় কয়েকজন পার্টনারের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে মারামারি হয়। এই ঘটনায় মামলা হলে ভারতীয় পুলিশ অন্যদের সঙ্গে হাশমতকেও গ্রেপ্তার করে। পাঁচ বছর কারাভোগের পর ভারতীয় আদালত হাশমতকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। কিন্তু দেশে ফেরার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
মানবপাচার চক্রের খপ্পর
মোহাম্মদ ইরা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে জানান, জেল থেকে বের হয়ে ইতালি ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকেন হাশমত মোহাম্মদি। তার সঙ্গে পরিচয় হয় বাংলাদেশ ও ভারতের দুই মানবপাচারকারীর সঙ্গে। তাদের একজন যশোর এলাকার মো. মাসুম। চক্রের আরেক সদস্য ভারতীয় নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে গেলে ইতালি যাওয়া যাবে বলে নিশ্চয়তা দেন তারা।
দুই মানবপাচারকারীর খপ্পরে পড়ে গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন হাশমত। এর মধ্যে ১১-১২ এপ্রিলের দিকে তার যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভাই ইরাকে ফোনে জানান, সামনে একটা নদী (ইছামতি) আছে। এটা পার হলেই তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন এবং নিরাপদ হয়ে যাবেন।
এ সময় মানবপাচারকারী দুজনের সঙ্গেও ইরার কথা হয়। কিছু সময় হাশমতের সঙ্গে ইরার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইরা তথন মানবপাচারকারীদের ফোনও বন্ধ পান। তবে কয়েক দিন পর মানবপাচারকারীদের সঙ্গে ইরার আবার যোগাযোগ হয়। ইরাকে দুইটি ছবি পাঠিয়ে জানানো হয়, তার ভাই মারা গেছে এবং বাংলাদেশের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এরপর থেকে মানবপাচারকারীদের ফোন বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে মহেশপুর থানার এসআই টিপু সুলতান বলেন, গত ২২ এপ্রিল আহসান নামে একজনের মাধ্যমে মোহাম্মাদ ইরার সঙ্গে কথা হয়। মরদেহটি ইরার ভাইয়ের বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি। তার আরেক ভাই লন্ডন প্রবাসী। তিনি বাংলাদেশে আসার জন্য ভিসাসহ অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত করছেন। অভিযুক্ত মাসুমের ফোন নম্বর পেয়েছি। তদন্ত শুরু করেছি।
সীমান্তে সুসংগঠিত পাচারচক্র
সীমান্তবর্তী বাসিন্দারা জানান, সীমান্তে চোরাচালান ও মানবপাচারকারী চক্রের তৎপরতা বেড়ে গেছে। একই এলাকায় তিন দিনের ব্যবধানে দুটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগজনক।
তবে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) বলছে, সীমান্তে যে কোনো ধরনের অপরাধ ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পাচারকারী চক্রের হোতাদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাচারকারী চক্রগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত। স্থানীয়দের সহযোগিতা ছাড়া এই চক্র পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম বলেন, বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তে পাচারকারীদের তৎপরতা বন্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি। স্থানীয়দের সচেতন করছি, যাতে কেউ এই মরণফাঁদে পা না দেয়।
আফগান নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে জানানো হয়েছে মরদেহে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও রহস্য উদঘাটন হবে।


