বগুড়া/দলিলের নকল তুলতে ঘুষ, ২ কোটি রাজস্বের ৮ কোটি টাকা আদায়

নিজের কেনা জমি, নিজের দলিল—সবকিছু বৈধ থাকা সত্ত্বেও সেই দলিলের একটি সার্টিফাইড কপি বা নকল তুলতে সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে ৪ থেকে ৬ গুণ পর্যন্ত বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বগুড়া জেলার ১২টি উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে আট মাসে নকল বাবদ সরকারের রাজস্ব এসেছে ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অথচ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একই সেবায় অঘোষিত ‘রেট’ বসিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে ঘুষ ও অতিরিক্ত পারিশ্রমিক হিসেবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৮ কোটি টাকারও বেশি।
বগুড়ার বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, অফিসে অফিসে ঝুলানো সরকারি নির্দেশনার ব্যানারগুলো যেন স্রেফ প্রদর্শনী। প্রকাশ্যে টানানো তালিকায় কয়েক শ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা ফি লেখা থাকলেও বাস্তবে প্রতিটি নকল তুলতে আদায় করা হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।
কাহালু সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে বোনের জমির দলিলের সার্টিফাইড কপি তুলতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন গণমাধ্যমকর্মী খালেদ সিদ্দিকী। তার দলিলের নকল তুলতে সরকারি ফি ছিল ১ হাজার টাকা। কিন্তু তার কাছে চাওয়া হয় ২ হাজার ৭০০ টাকা। গণমাধ্যমকর্মী পরিচয় দেওয়ার পর ১ হাজার ৫০০ টাকায় কাজটি করে দেওয়ার কথা বলা হয়। পরে রসিদ চাইলে এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয় বলে জানান তিনি।

কাহালুতেই সম্প্রতি জমির সার্টিফাইড কপি তুলেছেন কাঁচামালের আড়তদার বিপলু ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী হাসান আলী। তাদের দলিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিটির নকলের সরকারি ফি ৬২৫ টাকা। কিন্তু তাদের কাছ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। দুজনেরই দাবি, এর আগেও জমির নকল তুলতে একই হারে অর্থ দিতে হয়েছে।
অর্থাৎ, কাহালুতে একটি দলিলের নকল তুলতে সরকারি ফি যেখানে এক রকম, সেখানে বাস্তবে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ টাকা। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি ফির বাইরে নেওয়া এই অর্থের কোনো রসিদও দেওয়া হয় না।
গাবতলী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়েও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। প্রায় ১৫ দিন আগে সেখানে ২ হাজার ১০০ টাকা জমা দিয়ে দলিলের নকলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক বৃদ্ধ। সরকারি ফির বাইরে এত টাকা কেন দিতে হয়েছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, কার্যালয়ে কাজ করাতে এভাবেই টাকা দিতে হয়েছে।
বগুড়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দলিল লেখকদের সহকারীদের কাছে নকল তোলার খরচ জানতে চাইলে তারা জানান, একটি দলিলের সার্টিফাইড কপি তুলতে ৩ হাজার টাকা লাগবে। সরকারি ফি কত—এ বিষয়ে তারা কোনো কথা বলেননি। বরং নকল তোলার জন্য নিজেদের নির্ধারিত ‘রেট’-এর কথাই জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বগুড়া সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি দলিলের নকল তুলতে ৩ হাজার টাকা, কাহালুতে ২ হাজার ৭০০ টাকা, সারিয়াকান্দি ও সোনাতনায় ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং কাহালু-নন্দীগ্রামে কমপক্ষে ২ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। শেরপুর ও শিবগঞ্জেও একটি দলিলের সার্টিফাইড কপি তুলতে অন্তত ৩ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে অভিযোগের চিত্র শুধু কয়েকজন সেবাগ্রহীতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন কার্যালয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দলিল লেখক, নকলনবিশ ও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মধ্যে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়ে এক ধরনের অলিখিত সমঝোতা রয়েছে। অফিসভেদে নির্ধারিত হয়েছে আলাদা ‘রেট’। সরকারি নির্ধারিত ফির পরিবর্তে ওই রেটেই অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের।

অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে রাখঢাকও নেই বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বগুড়া সদর দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ফরহাদুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত পারিশ্রমিকে তাদের পোষায় না। এ কারণে তারা নিজেদের মতো করে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নির্ধারণ করেছেন।’
কোথায় যাচ্ছে অতিরিক্ত ৮ কোটি টাকা?
বগুড়া জেলা রেজিস্ট্রারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে জেলার বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে ৪৮ হাজার ৩৮৫টি দলিলের সার্টিফাইড কপি বা নকল তোলা হয়েছে। এসব সেবা থেকে সরকারের রাজস্ব এসেছে ২ কোটি ৩১ লাখ ৬৬ হাজার ৮০৭ টাকা। অনুসন্ধানে পাওয়া বিভিন্ন কার্যালয়ে অতিরিক্ত আদায়ের হার এবং নকল উত্তোলনের সংখ্যা ধরে হিসাব করলে, একই সময়ে সরকারি ফির বাইরে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের পরিমাণ ৮ কোটি টাকার বেশি।
তবে নকল বা সার্টিফাইড কপি উত্তোলন সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অসংখ্য সেবার মধ্যে মাত্র একটি। দলিল নিবন্ধন, তল্লাশি ও পরিদর্শন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, দান বা হেবা, বণ্টননামা ও বন্ধকসহ বিভিন্ন সেবার জন্যও সরকার নির্ধারিত ফি ও সম্মানী রয়েছে। এসব সেবাতেও নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে সেবাগ্রহীতাদের।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক এশিয়া পোস্টকে বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে অসহায় মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
তার দাবি, প্রতি মাসে অর্ধকোটি টাকার বেশি ঘুষ আদায় হচ্ছে। তারা বিভিন্ন সময় এসব দুর্নীতির বিষয় তুলে ধরেছেন। এরপরও কিছু অসাধু কর্মকর্তা অতিরিক্ত অর্থ আদায় বন্ধ করছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করেছেন। বগুড়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার অনিমেশ কুমার পাল, কাহালু ও গাবতলীর সাব-রেজিস্ট্রার কাইউম মজুমদার এবং শাজাহানপুরের সাব-রেজিস্ট্রার শাকিব রায়হান শরীফ তাদের কার্যালয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া জেলা রেজিস্ট্রার মো. সিরাজুল করিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, দলিলের সার্টিফাইড কপি বা নকল তুলতে প্রতিটি খাতে সরকারি ফি নির্ধারিত রয়েছে। দলিল লেখকদের জন্যও নির্ধারিত সম্মানী রয়েছে। এর বাইরে কোনো ধরনের অর্থ আদায়ের সুযোগ নেই।

