খুলনায় ১৫২ প্রতিমায় পৌরাণিক আখ্যান, ধানের শীষে দুর্গা

কোথাও রামায়ণ-মহাভারতের পৌরাণিক আখ্যান, কোথাও আবার চিনিগুঁড়া ধানের সোনালি শীষে সজ্জিত দেবী দুর্গা। প্রতিমার বৈচিত্র্য আর ঐতিহ্যের ভিন্নধর্মী উপস্থাপনায় এবার দুর্গোৎসবে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি হয়েছে খুলনায়। ডুমুরিয়ার মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরে ৫২ বছর পূর্তি উপলক্ষে নির্মাণ করা হচ্ছে ১৫২টি প্রতিমা। অন্যদিকে, নগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা মণ্ডপে ধানের শীষ দিয়ে সাজানো হয়েছে দুর্গাপ্রতিমা।
ডুমুরিয়ার মিকশিমিল সাহাপাড়া সার্বজনীন পূজা মন্দিরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। কোথাও খড়ের কাঠামোয় মাটি লাগানো হচ্ছে, কোথাও চলছে প্রতিমার মুখাবয়ব ও অলংকার তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ। প্রায় তিন মাস ধরে দিনরাত পরিশ্রম করছেন শিল্পীরা।
মন্দির কর্তৃপক্ষ জানায়, পূজার ৫২ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবার ১৫২টি প্রতিমা নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটি প্রতিমায় তুলে ধরা হবে পৃথক পৌরাণিক কাহিনি বা ধর্মীয় আখ্যান।
মন্দির প্রাঙ্গণে থাকছে দুর্গার বিভিন্ন রূপ, বিশাল আকৃতির হনুমান, ৫১ পীঠের দৃশ্য এবং জগন্নাথদেব, বলরাম ও সুভদ্রার প্রতিমা। প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি মণ্ডপ সাজানো হচ্ছে বিশেষ আলোকসজ্জায়। দর্শনার্থীদের জন্য থাকছে লাইট-সাউন্ড ও লেজার শো। এ ছাড়া নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৯০ ফুট উঁচু তোরণ।
মন্দিরের সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সাহা বলেন, দেবীর আশীর্বাদ শুধু দেশের মানুষের জন্য নয়, বিশ্বের সব মানুষের কল্যাণ বয়ে আনুক—এটাই তাদের প্রত্যাশা। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সম্প্রীতি ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান তারা।

অন্যদিকে, খুলনা নগরীর বাগমারা তেঁতুলতলা মণ্ডপে এবার চিনিগুঁড়া ধানের পাকা শীষ দিয়ে সাজানো হয়েছে দুর্গাপ্রতিমা। প্রচলিত অলংকারের পরিবর্তে সোনালি ধানের শীষের আবরণে দেবীর অবয়বে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার কৃষিজীবন ও শস্যসম্ভারের চিত্র। এ সাজসজ্জা সম্পন্ন করতে শিল্পীদের সময় লেগেছে এক মাসেরও বেশি।
মণ্ডপের সভাপতি রঞ্জিত কুমার রায় বলেন, প্রতিমা সাজানোর উপযোগী চিনিগুঁড়া ধানের শীষ সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। নানা চেষ্টা করে সেগুলো সংগ্রহ করতে হয়েছে। এমনভাবে ধানের শীষ ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে দেবীর রূপের পাশাপাশি ধানের স্বাভাবিক সৌন্দর্যও ফুটে ওঠে।
প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো একটি তেঁতুলগাছকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বাগমারা তেঁতুলতলা মন্দিরের পরিচিতি। সেখানে গত ৫৫ বছর ধরে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। এবার ধানের শীষ দিয়ে প্রতিমা সাজিয়ে ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। শরৎকাল, পাকা ধান ও নতুন ফসল ঘরে তোলার প্রত্যাশাকে একসূত্রে বেঁধেছে তাদের এ উদ্যোগ।
এদিকে দুর্গোৎসব ঘিরে খুলনা জেলা ও মহানগরীতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। পূজা উদ্যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলার নয়টি উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় ৮৮৫টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ডুমুরিয়ায় সর্বাধিক ২২৩টি মণ্ডপ রয়েছে। অন্যদিকে, খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) আওতাধীন আট থানায় রয়েছে ১২৪টি মণ্ডপ। সব মিলিয়ে জেলা ও মহানগরীতে মণ্ডপের সংখ্যা ১ হাজার ৯টি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৯৮১ এবং ২০২৪ সালে ছিল ৯৯১টি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির সিদ্দিকী শুভ্র বলেন, প্রতিটি মন্দির ও মণ্ডপে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। পূজার সময় ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার পাশাপাশি মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং পার্টি দায়িত্ব পালন করবে।
খুলনা মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার কুণ্ডু বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু একটি সম্প্রদায়ের উৎসব নয়, এটি বাঙালির উৎসব। এ উৎসবের মধ্য দিয়ে তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান।
