তিনবিঘা করিডরে বিজিবি-বিএসএফ পতাকা বৈঠক

কাঁটাতারের বেড়া কিংবা কোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা সীমান্তের শূন্যরেখার (জিরো লাইন) ১৫০ গজের মধ্যে করার কোনো সুযোগ নেই বলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) সাফ জানিয়ে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
শনিবার (২৩ মে) লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ভারত সীমান্ত বেষ্টিত তিনবিঘা করিডোরে অনুষ্ঠিত উভয় বাহিনীর ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একটি পতাকা বৈঠকে বিজিবির পক্ষ থেকে এই কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়।
এর আগে, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার একাধিক সীমান্তে গতকাল শুক্রবার বিজিবির তীব্র বাধার মুখে আজ নিজেদের জমি মাপজোখ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় ভারত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল তিনবিঘা করিডোর এলাকাসহ কয়েকটি সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই আজ এই জরুরি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
যদিও বৈঠকের বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমে কেউ মুখ খোলেননি, তবে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন রংপুর ৫১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান। অপরদিকে ভারতের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন ১৭৪ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট ভিনোদ রেঢু এবং ৩০ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ড্যান্ট এস নারায়ণ মিশরা।
বৈঠকে বিএসএফ দাবি করে, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ৫০ গজ ভেতরে ভারতীয় নাগরিকদের জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে মাপজোখ করে ৩ ফুট উচ্চতার বাঁশের খুঁটি স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এটিকে কেন্দ্র করে বিজিবি জওয়ানরা অস্ত্র তাক করে 'ফায়ারিং পজিশনে' চলে যায়, যা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত।
এর প্রত্যুত্তরে বিজিবির পক্ষ থেকে কড়া জবাব দিয়ে বলা হয়, ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনাকাঙ্ক্ষিত। বিএসএফ সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে জিরো লাইনে খুঁটি স্থাপন করায়, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আত্মরক্ষার্থে বিজিবি তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক অবস্থান গ্রহণ করেছিল।
একই সাথে সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে হলে তা যে অবশ্যই শূন্যরেখার ১৫০ গজের বাইরে করতে হবে, সেটিও বিএসএফকে কড়া ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেয় বিজিবি।
এদিকে, এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই তিনবিঘা করিডোর এলাকা পরিদর্শনে আসেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেখলিগঞ্জ বিধানসভা থেকে নির্বাচিত বিজেপির বিধায়ক দধিরাম রায়। তিনি ওখানকার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভারতের অনড় অবস্থানের কথা জানান।
দধিরাম রায় বলেন, পরিদর্শনে এসে আমি বিএসএফের সঙ্গেও বৈঠক করেছি। সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের যে চলমান কাজ, তা কোনো অবস্থাতেই বন্ধ হবে না। পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের আলোচনা যেমন চলবে, তেমনি আমাদের সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজও অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় ও বিজিবি সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পাটগ্রামের কুচলিবাড়ি ইউনিয়নের কলসির মুখ, তিনবিঘা করিডোর ও দহগ্রাম সীমান্তে বিজিবিকে সম্পূর্ণ অন্ধকার রেখে ও কোনো প্রকার না জানিয়ে শূন্যরেখায় জমি মাপজোখ এবং বাঁশের খুঁটি স্থাপন শুরু করে বিএসএফসহ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি লঙ্ঘন করে ভারতের এই আকস্মিক কর্মকাণ্ডে বিজিবি তীব্র বাধা দিলে সীমান্ত জুড়ে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। বিজিবির অনড় ও কঠোর অবস্থানের মুখে ভারতীয় পক্ষ কোথাও কোথাও লাগানো খুঁটি সরিয়ে নেয় এবং কাজ বন্ধ রেখে তাদের লোকজন পিছু হটতে বাধ্য হয়। বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিউর রহমান বলেন, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো ধরনের স্থাপনা বা কাঠামো নির্মাণ করা যাবে না। বিএসএফ আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে এবং বিজিবির বাধা উপেক্ষা করে জোরপূর্বক খুঁটি স্থাপন করছিল। এই অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই বিজিবি নিয়ম মেনে অস্ত্র কক করে ফায়ারিং পজিশনে গিয়েছিল।
পরে বিএসএফ অভিযোগ তোলে যে, কিছু বাংলাদেশি নাগরিক ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ভারতীয় নাগরিকদের চাষাবাদ নষ্ট করছেন। এর জবাবে বিজিবি অধিনায়ক বলেন, আমাদের কোনো নাগরিক যদি ভারতের ভেতর অবৈধভাবে প্রবেশ করেন, তবে আপনারা তাকে আটক করে আমাদের কাছে বুঝিয়ে দিন, আমরা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিচার করব।
আর যদি কোনো বাংলাদেশির কারণে চাষাবাদ নষ্ট হয়ে থাকে, তবে আমরা তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। আপনারা কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করতেই পারেন, তাতে আমাদের সমস্যা নেই। কিন্তু নিচে পাকা করে যে কোনো ধরনের স্থায়ী কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করতে হলে তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন মেনে সীমান্ত থেকে ১৫০ গজের বাইরে দিতে হবে।
