logo
Advertisement

ময়মনসিংহে ৮ মাসে ১৪৩ মৃত্যু, মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের দাপট চলছেই

কামরুজ্জামান মিন্টু
ময়মনসিংহ, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহে ৮ মাসে ১৪৩ মৃত্যু, মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের দাপট চলছেই
ময়মনসিংহে সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলছে অবৈধ যানবাহন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মহাসড়কে বাস-ট্রাকের ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ সামনে চলে এল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পেছনে দ্রুতগতির বাস। অটোরিকশাটি সরতে না সরতেই বিপরীত দিক থেকে ছুটে এল আরেকটি যান। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তৈরি হলো ভয়াবহ পরিস্থিতি। শেষ পর্যন্ত দুর্ঘটনা না ঘটলেও এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্য ময়মনসিংহের মহাসড়কগুলোতে এখন অনেকটাই নিয়মিত।

জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে যেসব যান চলাচলের কথা নয়, সেসব যানই প্রকাশ্যে চলাচল করছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, থ্রি-হুইলার, ইঞ্জিনচালিত ভ্যান ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা কখনো বাসের সামনে, কখনো ট্রাকের পাশ দিয়ে ছুটছে। অনেক ক্ষেত্রে চালকের লাইসেন্স নেই, যানবাহনের নেই ফিটনেস সনদ। তারপরও দিনের পর দিন মহাসড়কে এসব যান চলাচল করছে।

ময়মনসিংহ শহর ও আশপাশের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ময়মনসিংহ-শেরপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়ক এবং ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পথে ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচল রয়েছে। কোথাও কোথাও এসব যান দ্রুতগতিতে বাস ও ট্রাককে ওভারটেক করছে। আবার কোনো কোনো যান হঠাৎ থামিয়ে যাত্রী তুলছে বা নামাচ্ছে। ফলে পেছন থেকে আসা বড় যানকে আকস্মিকভাবে গতি কমাতে হচ্ছে।

সর্বশেষ শুক্রবারও (১১ সেপ্টেম্বর) ঘটেছে সড়ক দুর্ঘটনা। এদিন জুমার নামাজের আগে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর আকুয়া বাইপাস মোড়ে ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে নারীসহ দুজন মারা যান। নিহত সাদেক আলী জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার চৌদার গ্রামের একজন ব্যবসায়ী। তার এক আত্মীয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাকে দেখতে অটোরিকশায় করে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন সাদেক আলী।

দুর্ঘটনায় সাদেক আলীসহ আরেক নারী যাত্রীর মৃত্যু হয়। ঘটনাস্থলে রক্তাক্ত অবস্থার দৃশ্য উপস্থিত লোকজনকে নাড়া দেয়। দুর্ঘটনায় আহত কয়েকজনের মধ্যে ওই নারী যাত্রীর শিশুসন্তানের অবস্থা সবচেয়ে গুরুতর ছিল। তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে হরহামেশাই।

মহাসড়কে চলাচলকারী বাসচালকদের ভাষ্য, সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে ছোট যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে।

তবে মহাসড়কে দুর্ঘটনার জন্য শুধু অবৈধ যানবাহনই দায়ী নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যাত্রী ও চালকদের ভাষ্য, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক, অদক্ষ চালক, চালকের ঘুমঘুম ভাব, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো, পথচারীর অসতর্ক পারাপার এবং সড়কের বিভিন্ন অংশের ভাঙাচোরাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

তবে এসব কারণের সঙ্গে অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল যুক্ত হলে বিপদের মাত্রা আরও বাড়ে। কারণ, মহাসড়কে একটি ছোট যানবাহনের হঠাৎ গতি পরিবর্তন বা ভুল লেন নেওয়া শুধু ওই যানটির যাত্রীদের নয়, আশপাশে থাকা একাধিক যানবাহনের যাত্রীদেরও বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ময়মনসিংহ কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ময়মনসিংহে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৪১ জন। আহতদের অনেকেই এখনো চিকিৎসাধীন। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতেও রয়েছেন।

সংস্থাটির হিসাবে, ময়মনসিংহে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার। মোটরসাইকেল রয়েছে প্রায় ৭০ হাজার। লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাসের সংখ্যা ৩৬০টি। এর মধ্যে প্রায় ২০০টি বাস ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন ছাড়াই চলাচল করছে। ট্রাক ও পিকআপ রয়েছে প্রায় ৯০০টি; এসব যানবাহনের বড় একটি অংশের ফিটনেস নেই।

এর বাইরে বাস্তবতার আরও বড় চিত্র পাওয়া যায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে। জানা গেছে, অনুমোদিত সংখ্যার প্রায় তিন গুণ সিএনজিচালিত অটোরিকশা বাস্তবে সড়কে চলাচল করছে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে নিয়মিত বাস চালান সামাদ মিয়া। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে যখন ছোট গাড়িগুলো হঠাৎ সামনে চলে আসে। বাসের গতি কমাতে সময় লাগে। সামনে অটোরিকশা থাকলে হর্ন দিলেও অনেক সময় সরতে চায় না। আবার সুযোগ পেলেই ওভারটেক করে। একটা ভুলের কারণে বাসের যাত্রীরা জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।

ময়মনসিংহ-শেরপুর সড়কের আরেক বাসচালক মনির হোসেন বলেন, অনেক থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশার চালক মহাসড়কের নিয়ম ঠিকমতো জানেন না। তারা কখনো ডান দিক দিয়ে, কখনো বাম দিক দিয়ে চলে। যাত্রী নামানোর জন্য যেখানে-সেখানে গাড়ি থামান। পেছন থেকে বাস আসছে কি না, সেটাও অনেক সময় খেয়াল করেন না।

দীর্ঘদিন ধরে বাস চালান হারুন মিয়া। তিনি বলেন, মহাসড়কে এখন শুধু বড় গাড়ির সঙ্গে বড় গাড়ির প্রতিযোগিতা নেই। ছোট গাড়িগুলোও দ্রুত চলতে চায়। যাত্রী ধরার জন্য দুই-তিনটা অটোরিকশা পাশাপাশি চলতে থাকে। তখন বাস চালানো খুব কঠিন হয়ে যায়। পুলিশ সামনে থাকলেও এসব গাড়ি চলতে দেখা যায়।

তবে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকদের বক্তব্যও ভিন্ন। অটোরিকশাচালক আজিজ মিয়া বলেন, আমরা জানি মহাসড়কে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দূরের যাত্রী পেলে ভাড়া ভালো পাওয়া যায়। সংসার চালাতে গিয়ে অনেক চালক বাধ্য হয়ে মহাসড়কে ওঠেন ও দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান।

আরেক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আব্দুল কাদির বলেন, সব চালক বেপরোয়া নন। কেউ কেউ নিয়ম মেনেই গাড়ি চালান। কিন্তু যাত্রী দ্রুত যেতে চাইলে চালকের ওপরও চাপ থাকে। এক জায়গায় দাঁড়ালে যাত্রী বলেন দ্রুত যেতে, আবার ধীরে চালালে অন্য গাড়ি এসে যাত্রী নিয়ে যায়।

অটোরিকশাচালক ফারুক মিয়া বলেন, কাগজপত্রের সমস্যা আছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক গাড়ির ফিটনেস ঠিক নেই, অনেক চালকের লাইসেন্সও নেই। মাঝেমধ্যে পুলিশ মামলা দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে কাগজপত্র দেখতে চাইলে কিছু উৎকোচ দিলেই মামলা থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

মহাসড়কে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী সালমা খাতুন বলেন, বাসে উঠলে নিরাপদ মনে হয়। কিন্তু মাঝেমধ্যে বাসে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠার কারণে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠতে হয়। অটোরিকশাগুলো সড়ক-মহাসড়কের মাঝখান দিয়ে দ্রুত চলে। তখন খুব ভয় লাগে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে গেলে আতঙ্ক আরও বেশি হয়।

আরেক যাত্রী রফিকুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় দেখি অটোরিকশা বাসকে ওভারটেক করছে। আবার বাসও দ্রুতগতিতে অটোরিকশাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। দুই গাড়ির মাঝখানে আমরা যাত্রীরা বসে থাকি। তখন মনে হয়, সামান্য ভুল হলেই বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

ময়মনসিংহ মঞ্চের সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, পুলিশের অভিযান ও মামলার দাবি থাকলেও মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের উপস্থিতি কমছে না। বরং প্রতিদিনই এসব যানকে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। এখানে সমস্যাটি শুধু একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা একটি থ্রি-হুইলার মহাসড়কে উঠছে কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চালকের যোগ্যতা, গাড়ির ফিটনেস, নিবন্ধন, গতি নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি। এসবের কোনো একটি জায়গায় দুর্বলতা থাকলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। সবগুলো জায়গায় দুর্বলতা থাকলে সেই ঝুঁকি ভয়াবহ আকার নেয়।

নাগরিক সংগঠক ও কলেজ শিক্ষক মাসুম বিল্লাহ বলেন, মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল বন্ধ করতে হলে শুধু আটক বা মামলা দিয়ে দায় শেষ করার সুযোগ নেই। কোন সড়কে কোন ধরনের যান চলতে পারবে, অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা কত, বাস্তবে কত চলছে, কার ফিটনেস নেই এবং কার লাইসেন্স নেই—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে আইন ভঙ্গের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তারও তদন্ত প্রয়োজন। কারণ দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কারণ খুঁজে বের করার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ যানকে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। ময়মনসিংহের মহাসড়কে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সেটিই—আইন শুধু কাগজে থাকবে, নাকি তার বাস্তব প্রয়োগও দেখা যাবে।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ময়মনসিংহের সভাপতি আব্দুল কাদের চৌধুরী মুন্না বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে হলে চালকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের দক্ষতা যাচাই করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজলের ভাষ্য, সড়কে আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের শিথিলতা থাকলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন। অবৈধ যানবাহন বন্ধে প্রশাসন, পুলিশ, বিআরটিএ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।

বিআরটিএ ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের ট্রাফিক পরিদর্শক (প্রশাসন) গোলাম মওলা বলেন, মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল বন্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অবৈধ যানবাহনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।