কাগজে নিয়ম, মাঠে অনিয়ম—বালু উত্তোলন ঘিরে নতুন শঙ্কা

মানিকগঞ্জে নদীভাঙন এখন আর কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বালু উত্তোলন ঘিরে অনিয়ম, প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব ও সহিংসতা। জেলার পদ্মা, যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতী ও গাজীখালিসহ বিভিন্ন নদীতে বর্ষা এলেই তীব্র ভাঙন শুরু হয়। প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, এই ভাঙনের পেছনে শুধু প্রকৃতি নয়, বালুমহালকেন্দ্রিক অনিয়মও দায়ী।
সম্প্রতি শিবালয় উপজেলার তেওতা বালুমহাল ঘিরে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। গত ৩ এপ্রিল আলোকদিয়া চরে বালুমহালের এক ব্যবস্থাপককে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বালু উত্তোলন ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, নির্ধারিত নিয়ম না মেনে ড্রেজার দিয়ে নির্বিচারে বালু তোলায় নদীতীর দুর্বল হয়ে পড়ছে, ফলে ভাঙন বাড়ছে। প্রশাসনের কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিয়েও তারা কার্যকর প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন। তাদের কাছে বালুমহাল এখন আতঙ্কের প্রতীক।
আলোকদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মেহেরজান বেগম (৫৫) বলেন, নদীভাঙনে আগের বসতভিটা হারিয়ে নতুন জায়গায় ঘর তুলেছিলেন। কিন্তু সেখানেও ভাঙন শুরু হয়েছে। তাঁর ভাষায়, আগে কিছুটা প্রাকৃতিক প্রভাব থাকলেও এখন ড্রেজারের কারণেই দ্রুত জমি নদীতে বিলীন হচ্ছে।
চরকাটারির বাসিন্দা রহিম বাদশা (৬২) বলেন, গত কয়েক বছরে বালু উত্তোলনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন তীব্র হয়েছে। তার অভিযোগ, প্রভাবশালীরা বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত থাকায় অভিযোগ করেও কোনো ফল হয় না।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিবছরের মতো এবারও শর্তসাপেক্ষে দরপত্রের মাধ্যমে বালুমহাল ইজারা দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরে তিনটি বালুমহালের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে হরিরামপুরের লেছড়াগঞ্জ বালুমহালে উপযুক্ত দরদাতা না পাওয়ায় পুনরায় দরপত্র ডাকা হয়েছে। মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চামটা-পৌলী-বিলবাড়িয়াবিল বালুমহাল পেয়েছে বিজু এন্টারপ্রাইজ এবং শিবালয়ের তেওতা বালুমহাল পেয়েছে একরাম এন্টারপ্রাইজ।
তবে ইজারাদারদের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বিজু এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. কামাল হোসেন বলেন, তারা নিয়ম মেনেই বালু উত্তোলন করছেন এবং এতে কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। অনিয়ম হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদারি প্রতিনিধি স্বীকার করেন, নির্ধারিত স্থানে অনেক সময় পর্যাপ্ত বালু পাওয়া যায় না। ফলে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে সীমানার বাইরে গিয়ে বালু তুলতে হয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, বালুমহাল ঘোষণার আগে পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়। সব ধরনের যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, নদীভাঙন মূলত প্রাকৃতিক কারণে ঘটে এবং বালুমহালের কারণে ভাঙনের সম্ভাবনা নেই। নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই বলেও তিনি দাবি করেন। কেউ আইন ভঙ্গ করলে ইজারা বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।