রংতুলির আঁচড়ে সরু গলিতে বড় স্বপ্ন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের কাজীপাড়ার একটি সরু গলি। একসময় সেখানে স্থানীয়দের হট্টগোল ছিল নিত্যদিনের চিত্র। সেই জায়গায় গড়ে উঠেছে সৃজনশীলতার উজ্জ্বল কেন্দ্র। যার নাম হাতে খড়ি আর্ট একাডেমি। চিত্রশিল্পী মকবুল হোসেন সজীবের স্বপ্ন থেকে জন্ম নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠান।
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই একাডেমিতে বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। তাদের মধ্যে দুজন জাতীয় পর্যায়ের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী এখানে নিয়মিত চিত্রাঙ্কনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে নানা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কারও অর্জন করেছে।
প্রতিষ্ঠাতা মকবুল হোসেন সজীবের স্বপ্ন–একটি আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করা। আছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা। তবু বড় স্বপ্ন নিয়ে সরু গলিতে শুরু করেছেন যাত্রা। ওয়ার্ল্ড আর্ট ভিলেজ গড়ে তুলতে নিজে লড়ছেন, প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করছেন।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ছিল হাতে খড়ি আর্ট একাডেমির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দিনটি ঘিরে আয়োজন করা হয় বিশেষ চিত্রাঙ্কন কর্মশালা।
সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলা কর্মশালায় অংশ নেয় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী। রং-তুলির আঁচড়ে তারা ফুটিয়ে তোলে কল্পনার জগৎ। কারও কাগজে উঠে আসে গ্রামীণ জনজীবন, কারও ছবিতে ব্যস্ত শহরের কোলাহল, আবার কেউ আঁকে আকাশ, চাঁদ-সূর্যের রহস্যময়তা।
কর্মশালায় সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বর্ণ। এই ছাত্রী জলরঙে এঁকেছে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের দৃশ্য। তার তুলির টানে যেন ফুটে উঠেছে এক পরিণত শিল্পীর দক্ষতা; যা উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করে।
শুধু বর্ণই নয়, এসএসসি পরীক্ষার্থী প্রাপ্তি সাহা, পঞ্চম শ্রেণির মৃদুতা চৌধুরী, ষষ্ঠ শ্রেণির সারা এবং অষ্টম শ্রেণির ইমরা জান্নাত সুরাসহ আরও অনেক শিক্ষার্থী তাদের সৃষ্টিশীল কাজ দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
কর্মশালা ঘুরে দেখে মনে হলো–যেন ছোট্ট একটি জাদুঘর। একাডেমির দেয়ালজুড়ে আঁকা হয়েছে নানা ধরনের থ্রিডি চিত্র; যা মোবাইল ক্যামেরায় তাক করলেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। কোথাও প্রাণী দৌড়াচ্ছে, কোথাও মনে হয় কেউ নুত্য করছে–এমন ভ্রম সৃষ্টি করা চিত্র প্রশিক্ষণার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও মুগ্ধ করেছে। এই চিত্রকর্মগুলোর পেছনে রয়েছেন স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত প্রশিক্ষক মাহমুদুর রহমান রিয়েল, তারেক কোরাইশী এবং চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী সৌরভ।

অভিভাবকদের মতে, এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি শিশু-কিশোরদের জন্য একটি নিরাপদ ও সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি করেছে; যা তাদের মোবাইল ফোনের আসক্তি থেকে দূরে রাখছে এবং সৃজনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন চপল। তিনি বলেন, এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ থেমে যায়। আশা করি, সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসবেন।
প্রতিষ্ঠাতা মকবুল হোসেন সজীব জানান, তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে একাডেমি গড়ে তোলেননি। তার একমাত্র লক্ষ্য সৃজনশীল শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। ২০০০ সাল থেকে চিত্রাঙ্কনের সঙ্গে যুক্ত তিনি। ওয়ার্ল্ড আর্ট ভিলেজ গড়ে তোলার স্বপ্ন থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা।