logo

৩৬ বছর লাশ কাটা সুধীরের আক্ষেপ: ‘দোকানে চা খেতে গেলেও মানুষ উঠে যায়’

৩৬ বছর লাশ কাটা সুধীরের আক্ষেপ: ‘দোকানে চা খেতে গেলেও মানুষ উঠে যায়’
সুধীর কুমার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে ময়নাতদন্তের কাজে যুক্ত রয়েছেন সুধীর কুমার ডোম। পূর্বপুরুষের ধারাবাহিকতায় পেশাটি ধরে রাখলেও বয়সের কারণে এখন আর একা সব সামলাতে পারেন না তিনি। বাধ্য হয়ে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন দুই ছেলে আশিক ও অন্তর। তবে বাবার সঙ্গে বছরের পর বছর এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে হাত লাগালেও সরকারি কোনো ভাতা বা বেতন মেলে না তাদের। বৃদ্ধ সুধীরের এখন একটাই মিনতি, তার অবর্তমানে যেন দুই ছেলের মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে হাসপাতালেই একটি চাকরির ব্যবস্থা হয়।

বাগেরহাট শহরের লিচুতলা এলাকার বাসিন্দা সুধীর কুমার ডোম। তাদের পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এই পেশা। তার দাদা ও বাবা মরদেহের ময়নাতদন্তের কাজ করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় বাবার কাছ থেকেই কাজ শেখেন সুধীর। এরপর নিজেই দায়িত্ব পালন শুরু করেন বাগেরহাট সদর হাসপাতালে। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ৩৬ বছর। তার দাবি, এই দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মরদেহের ময়নাতদন্ত করেছেন।

সুধীরের তিন ছেলে, বড় ছেলে আশিক, মেজো ছেলে স্যান্ডি ও ছোট ছেলে অন্তর। তাদের মধ্যে আশিক ও অন্তর দীর্ঘদিন ধরে বাবার কাজে সহযোগিতা করছেন। মরদেহ বহন, ওঠানো-নামানো, ফ্রিজিংসহ বিভিন্ন কাজে বাবার পাশে থাকতে হয় তাদের। বয়স বেড়ে যাওয়ায় এখন আর একা সব কাজ সামলানো সুধীরের পক্ষে সম্ভবও হয় না।

সুধীর কুমার ডোম বলেন, জীবনের প্রথম যখন লাশ কাটার কাজ শুরু করি তখন মনের মধ্যে ভয় ছিল। ধীরে ধীরে সেই ভয় কেটে গেছে। এখন অনেক কিছুই অভিজ্ঞতা দিয়ে করতে পারি। কিন্তু বয়স হয়েছে, আগের মতো আর পারি না। একা লাশ কাটা, বহন করা, ফ্রিজিং করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই আমার দুই ছেলে আমাকে সাহায্য করে। সরকার থেকে শুধু আমি বেতন পাই, আমার ছেলেরা কোনো বেতন পায় না।

তিনি আরও বলেন, আমরা ডোম বলে অনেকে আমাদের ভালো চোখে দেখে না। কোথাও চা খেতে গেলে মানুষ উঠে চলে যায়। অন্য কাজ করলে হয়তো এমন হতো না। আমাদের কাজের প্রয়োজন আছে তারপরও মানুষ আমাদের অবহেলা করে। মানুষের মৃত্যুর পর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও আমাদের পেশার প্রতি সমাজের একটি অংশের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। মানুষের মৃত্যুর পর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও আমাদের পেশার প্রতি সমাজের একটি অংশের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি।

মর্গে সুধীরের সঙ্গে কাজ করছে তার ছেলে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
মর্গে সুধীরের সঙ্গে কাজ করছে তার ছেলে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সুধীরের কাছে এই পেশা শুধু জীবিকা নয়, সার্বক্ষণিক দায়িত্বও। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই প্রস্তুত থাকতে হয় তাকে। দুর্ঘটনা বা অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটলে যেকোনো সময় হাসপাতালে ছুটে আসতে হয়। এমনকি পূজার দিনেও মরদেহ আসার খবর পেয়ে কাজে যোগ দিতে হয়েছে তাকে। তার অভিযোগ অন্যরা ছুটি পেলেও তাদের ছুটি পাওয়া কঠিন।

তার আশঙ্কা, চাকরি শেষ হয়ে গেলে কিংবা তিনি মারা গেলে দুই ছেলের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকবে না। দীর্ঘদিন ধরে বাবার সঙ্গে কাজ করলেও ছেলেদের নিজস্ব কোনো সরকারি চাকরি বা বেতনের ব্যবস্থা নেই। এই অনিশ্চয়তাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে।

তিনি বলেন, আমার ছেলেদের মা নেই। আমি মারা গেলে বা চাকরি শেষ হয়ে গেলে ওরা অসহায় হয়ে পড়বে। ওরা দীর্ঘদিন ধরে আমার সঙ্গে কাজ করছে। সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, আমার চাকরির পর যেন আমার ছেলেরা এখানে চাকরি করে খেতে পারে।

সুধীর কমার ডোমের বড় ছেলে আশিক বলেন, আমি আর আমার ছোট ভাই দীর্ঘদিন ধরে বাবার সঙ্গে কাজ করছি। বাবা একা সবকিছু করতে পারেন না। একটি মরদেহ ওঠানো-নামানো থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজেও আমাদের থাকতে হয়। কিন্তু সরকার থেকে আমরা কোনো বেতন পাই না। আমরা চাই, বাবার অবসরের পর যেন আমরা দুই ভাই এই হাসপাতালে সরকারি চাকরি পাই।

তিনি আরও বলেন, এই কাজ ছেড়ে অটোরিকশা চালালেও মানুষ আমাদের গাড়িতে উঠতে চাইবে না বলে মনে হয়। খাবারের দোকান দিলেও অনেকে আমাদের হাতে খাবার খেতে চাইবে না। আমাদের ঘৃণার চোখে দেখা হয়। আমরা চাই, সরকারিভাবে চাকরি করে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে।

ছোট ছেলে অন্তর বলেন, বাবার বয়স হয়ে যাওয়ায় একা মরদেহ ওঠানো-নামানো, ফ্রিজিং করা এবং ময়নাতদন্তের কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের উঁচু তলা থেকে মরদেহ নিচে নামিয়ে আনার মতো কাজও একা তার বাবার পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাবার সঙ্গে কাজ করছি। বাবা বেতন পেলেও আমরা কোনো টাকা পাই না। আমাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাবার যদি কোনো বিপদ হয়, তাহলে এই কাজ কে করবে? সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, আমাদের দুই ভাইকে যেন এই হাসপাতালে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাহলে আমরা ভালোভাবে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারব।

স্থানীয় বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন, ডোমের কাজ সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ পেশার মানুষকে অনেক সময় অবহেলার শিকার হতে হয়। চায়ের দোকান বা কোথাও খেতে বসলে কেউ কেউ তাদের কাছ থেকে উঠে চলে যান। অথচ তারাও সমাজের অন্য সবার মতো মানুষ। তাদের ঘৃণার চোখে না দেখে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। পাশাপাশি সরকারও যেন তাদের পাশে দাঁড়ায়।

এ বিষয়ে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, ময়নাতদন্ত হাসপাতালের একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। এ কাজে নিয়োজিত কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারি নিয়োগের বিষয়টি নির্দিষ্ট বিধিবিধান ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সুধীর কুমার ডোমের দুই ছেলের চাকরির দাবির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা যেতে পারে। তাদের নিয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার যথাযথ কর্তৃপক্ষের।