Advertisement

সোনালি স্বপ্ন এখন পচা ভুট্টার স্তূপ, দিশেহারা শত শত কৃষক

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ময়মনসিংহ
সোনালি স্বপ্ন এখন পচা ভুট্টার স্তূপ, দিশেহারা শত শত কৃষক
ছবি: এশিয়া পোস্ট

কয়েক মাস আগেও হালুয়াঘাটের মাঠজুড়ে ছিল সবুজ ভুট্টাগাছের সমারোহ। কৃষকের চোখে ছিল সোনালি স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে হতাশায়। শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায় বিপুল পরিমাণ ভুট্টা নষ্ট হয়ে গেছে। মাঠজুড়ে এখন দেখা যায় পচে যাওয়া ভুট্টার স্তূপ। ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শত শত কৃষক।

Advertisement

উপজেলার পূর্ব ও পশ্চিম গোবরাকুড়া গ্রামের কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব গ্রামের প্রায় সব ভুট্টাচাষিই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারও ফলন অর্ধেকেরও কমে গেছে, আবার কেউ পুরো ফসল হারিয়েছেন।

হালুয়াঘাটের কৃষকেরা প্রতিবছরই ভুট্টা চাষের ওপর নির্ভর করেন। ধানের তুলনায় লাভজনক হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকেই নতুন করে ভুট্টা চাষে আগ্রহী হয়েছেন। তবে এবার সেই আশায় বড় ধাক্কা লেগেছে।

অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ব্যাংক, এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ভুট্টা চাষ করেছেন। ফসল বিক্রির টাকায় ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা থাকলেও এখন তা অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

পূর্ব গোবরাকুড়া গ্রামের কৃষক রবিউল আওয়াল চার একর জমিতে ভুট্টা চাষ করেছিলেন। তাঁর ভাষায়, প্রতি একরে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আগে যেখানে প্রতি একরে ১০০ মণ পর্যন্ত ভুট্টা পাওয়া যেত, এবার পেয়েছি মাত্র চার মণ। তারও বেশির ভাগ পচে গেছে। ভেবেছিলাম ফসল বিক্রি করে ঋণ শোধ করব, সংসার চালাব। এখন কীভাবে ঋণের টাকা দেব, সেই চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

একই গ্রামের কৃষক তাইজুল ইসলাম বলেন, এক একর জমিতে ভুট্টা করেছি। বীজ, সার, সেচ, শ্রমিক-সব মিলিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু যে ভুট্টা উঠেছে, তার বড় অংশই বিক্রির অযোগ্য। ঋণ নিয়ে চাষ করেছি। এখন ফসলও নেই, টাকাও নেই।

কৃষক হেলাল উদ্দিন ও দুলাল মিয়া জানান, দুই একর জমিতে ভুট্টা চাষ করেও আশানুরূপ ফলন পাননি। যে সামান্য ভুট্টা পেয়েছেন, তার মান ভালো না হওয়ায় পাইকারেরা মাত্র দুই টাকা কেজি দরে কিনতে চাইছেন। এতে অনেক কৃষক ভুট্টা মাঠেই ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ময়মনসিংহ জেলায় এক হাজার ৮৫০ একর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ একর জমির ভুট্টা নষ্ট হয়েছে বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুট্টা চাষ হয়েছে হালুয়াঘাট উপজেলায়। এখানে প্রায় ৩৪০ একর জমিতে ভুট্টার আবাদ হয়েছে। সরকারি হিসাবে অন্তত সাত একর জমির ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। অনেক জমিতে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, চারা অবস্থায় শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টি হয়েছে। পরে গাছে ফুল আসার সময় এবং কাঁচা ভুট্টা গঠনের সময়ও একই ধরনের দুর্যোগ দেখা দেয়। ফলে অনেক ক্ষেতেই ভুট্টা পচে যায় কিংবা গাছে ভুট্টাই ধরেনি।

তাদের অভিযোগ, ক্ষতির সময় স্থানীয় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মাঠে দেখা যায়নি। ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন বা প্রণোদনার বিষয়ে কোনো আশ্বাসও পাননি তাঁরা।

ভুট্টা শুধু কৃষকের ফসল নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভুট্টা সংগ্রহ, পরিবহন, শুকানো ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অসংখ্য শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। উৎপাদন কমে যাওয়ায় তারাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এ ছাড়া পশু ও পোলট্রি খাদ্য শিল্পে ভুট্টার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে সরবরাহ কমে গেলে এর প্রভাব পড়তে পারে সংশ্লিষ্ট খাতেও।

প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি অধ্যক্ষ লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো সরকারের দায়িত্ব। দ্রুত সহায়তা না এলে অনেক কৃষক চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কৃষি অর্থনীতিতে।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. উম্মে হাবিবা বলেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে এবার শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে অনেক ভুট্টাচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হালুয়াঘাটের কয়েকটি গ্রামের কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। বিষয়টি লিখিতভাবে প্রধান কার্যালয়কে জানানো হবে, যাতে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া যায়।