পল্লী বিদ্যুতের তদন্ত/সিফাতের বিদ্যুৎ বিলের হিসেবে গরমিল নেই, বিভ্রান্তি চার মাসের হিসেবে

দুই মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার যে দাবি করেছিলেন কলেজশিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তদন্তে সেই দাবির সঙ্গে বিলের পরিমাণের মিল পাওয়া গেছে। তবে একটি মিটারের বিপরীতে নয়, তার বাড়ির তিনটি আবাসিক মিটারের জুলাই ও আগস্ট মাসের সম্মিলিত বিল হিসেবে ওই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) পল্লী বিদ্যুতের তদন্ত প্রতিবেদনে চার মাসের হিসাব একসঙ্গে তুলে ধরায় বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দুই মাসের গ্রাহক কপি ও পল্লী বিদ্যুতের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, উভয় হিসাবই মিলে যায়।
অসহনীয় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সম্প্রতি ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ভিডিও প্রকাশ করার অভিযোগে গ্রেপ্তার সিফাত আব্দুল্লাহ বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। দুই মাসে ১০ হাজার টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার দাবি করেছিলেন তিনি। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তদন্তেও বিলের পরিমাণ ১০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া গেছে, তবে এর ব্যাখ্যায় কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
কারাগারে থাকা সিফাতের পরিবারের কাছে থাকা গ্রাহক কপির সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতের তদন্ত প্রতিবেদনের বিল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দুটির তথ্যে মিল রয়েছে।
ভিডিওতে সিফাত আব্দুল্লাহ দুই মাসে ১০ হাজার টাকা বিল দেওয়ার কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে তিনি মোট ১০ হাজার ৬৮১ টাকা বিল পরিশোধ করেছেন। তবে এই বিল এসেছে একটি মিটারে নয়, বরং তিনটি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটারে। জুলাই ও আগস্ট মাসে ‘এস০০০৪৩৩৭’, ‘এস০০০২১৮৫’ এবং ‘এস০০০৪২৪৭’—এই তিনটি মিটারে সম্মিলিতভাবে ১০ হাজার ৬৮১ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর বোর্ড বাজার জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আহসান কবীর স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিফাত আব্দুল্লাহর বাবা মো. সেকান্দার আলীর গাজীপুর মহানগরীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের দুই তলা বাড়িতে মোট তিনটি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রথম মিটারে (এস০০০৪৩৩৭) মে মাসে ৪৫ ইউনিটে ৩১৭ টাকা, জুনে ৫০ ইউনিটে ৩৪২ টাকা, জুলাইয়ে ১৫০ ইউনিটে ১ হাজার ১৮২ টাকা এবং আগস্টে ৭৫ ইউনিটে ৫১৩ টাকা বিল আসে। এই মিটারে চার মাসে মোট ৩২০ ইউনিট ব্যবহারে বিল হয় ২ হাজার ৩৫৪ টাকা।

দ্বিতীয় মিটারে (এস০০০২১৮৫) মে মাসে ২৫০ ইউনিটে ১ হাজার ৮১২ টাকা, জুনে ২০০ ইউনিটে ১ হাজার ৫৮৪ টাকা, জুলাইয়ে ৪০০ ইউনিটে ৩ হাজার ৫৯৪ টাকা এবং আগস্টে ২৮৫ ইউনিটে ২ হাজার ৩৯৭ টাকা বিল আসে। অর্থাৎ, চার মাসে ১ হাজার ১৩৫ ইউনিট ব্যবহারে মোট বিল দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা।
তৃতীয় মিটারে (এস০০০৪২৪৭) মে মাসে ১২৫ ইউনিটে ৮৪৭ টাকা, জুনে ১২০ ইউনিটে ৬৯০ টাকা, জুলাইয়ে ২০৫ ইউনিটে ১ হাজার ৬৩৩ টাকা এবং আগস্টে ১৭৫ ইউনিটে ১ হাজার ৩৬২ টাকা বিল আসে। এই মিটারে চার মাসে মোট ৬২৫ ইউনিট ব্যবহারে ৪ হাজার ৫৩২ টাকা বিল পরিশোধ করতে হয়।
পল্লী বিদ্যুৎ চার মাসের হিসাব উপস্থাপন করায় কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হলেও, জুলাই ও আগস্ট মাসের গ্রাহক কপি এবং পল্লী বিদ্যুতের হিসাব পুরোপুরি মিলে যায়। তাদের হিসাবেও ওই দুই মাসে মোট বিল এসেছে ১০ হাজার ৬৮১ টাকা।
বোর্ড বাজার জোনাল অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক আহসান কবীর জানান, সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা গেছে, বিল প্রস্তুতকরণে কোনো অনিয়ম বা অতিরিক্ত বিল ধরা হয়নি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির মুখ্য সংগঠক আলী নাছের খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সিফাতের পরিশোধিত বিল ও পল্লী বিদ্যুতের হিসাবের মধ্যে কোনো গরমিল নেই। জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসের হিসাব আলাদাভাবে না দেখিয়ে চার মাসের মোট হিসাব প্রকাশ করায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে আরেক দফা সিফাতকে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
সিফাত আব্দুল্লাহর (২৫) বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়েছে পুলিশ। ওই মামলায় তাকে আদালতেও পাঠানো হয়েছে।
শুক্রবার দুপুরে গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রাব্বানী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বাসায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার দাবি করে ফেসবুক লাইভে এসে গালিগালাজ করেছিলেন সিফাত।
পুলিশের ওই কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যম ওয়াদা জানায়, গ্রেপ্তার সিফাত আব্দুল্লাহ ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে একটি আকস্মিক মিছিল আয়োজনের চেষ্টা করছিলেন। মামলার পর সিফাতকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে ওসি গোলাম রাব্বানী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও সরকার সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে সিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিফাতের এক মিনিটের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে গাজীপুরের নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিফাত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী।




