Advertisement

‘রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস সমাজদেহে ক্যানসারের মতো বাসা বেঁধেছে’

এশিয়া পোস্ট নিউজ, খুলনা
‘রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস সমাজদেহে ক্যানসারের মতো বাসা বেঁধেছে’
খুলনায় যুব সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, লুটপাট ও মাদক সমাজদেহে ক্যানসারের মতো বাসা বেঁধেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এসব ব্যাধির বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

Advertisement

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৬ উপলক্ষে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর যুব ও ক্রীড়া বিভাগের উদ্যোগে খুলনা প্রেস ক্লাবের লিয়াকত আলী মিলনায়তনে আয়োজিত যুব সম্মেলন-২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গোলাম পরওয়ার বলেন, যুবক মানেই অদম্য শক্তি। কোনো দানবীয় শক্তিকে যুবসমাজ বরদাশত করে না। অথচ সমাজে মাদক, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মতো মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে। এই ব্যাধি ভাঙতে হবে তরুণ-যুবকদের।

খুলনার বিভিন্ন এলাকায় তরুণদের মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে তরুণরা এখন পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। তারা মিছিল করছে, র‌্যালি করছে, পুলিশকে সহযোগিতা করছে এবং মাদক ব্যবসায়ীদের ধরে থানায় নিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী করতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীতে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে দাবি করে গোলাম পরওয়ার বলেন, একসময় ধারণা ছিল জামায়াতে ইসলামী মুরুব্বিদের সংগঠন। দাড়ি-টুপি ও পাঞ্জাবি পরা বয়স্ক লোকেরাই এখানে থাকেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলে গেছে। দলে দলে তরুণরা এখানে যোগ দিচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী এখন আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার বিপ্লবী কাফেলার নাম।

গণভোট ও জুলাই সনদ প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, একই দিনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের একটি ফল মেনে অন্যটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, একই মায়ের পেটে জমজ দুই সন্তান জন্ম নিলে মা একজনকে স্বীকার করে আরেকজনকে অস্বীকার করতে পারেন না। একই ভোটে দুটি ফল হয়েছে। একটি ধানের শীষের, আরেকটি গণভোটের। ধানের শীষের ফল গ্রহণ করবেন, কিন্তু গণভোটের ফল গ্রহণ করবেন না—এটা হতে পারে না।

বিএনপির সমালোচনা করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দলটির অবস্থান দ্বৈত। রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, পাঁচ মাসও পার হয়নি, দলীয় লোকদের বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন জায়গায় দলীয় লোক বসানো হয়েছে। এরপর টাকা-পয়সা, টেন্ডার ও উন্নয়নকাজের লুটপাটের বড় বাজার বসে যাবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার ব্যবহার নিয়েও সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, যারাই ক্ষমতায় গেছেন, জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা তারাই প্রথমে ভঙ্গ করেছেন। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ব্যাহত হবে।

খুলনা বিভাগে জামায়াতের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। তার ভাষ্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত এমপিদের নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে হবে। দলীয় পরিচয়ের কারণে অন্য কেউ জনপ্রতিনিধিদের কাজে খবরদারি করতে পারেন না।

স্থানীয় প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সমালোচনা করে গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব ও প্রশাসনের দায়িত্ব আলাদা। কোনো জনপ্রতিনিধি প্রশাসনের ওপর ব্যক্তিগত বা দলীয় প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না।

তিনি বলেন, আগের দল ভাবত দেশটা তাদের বাপের। এখন দেশটা কার। দেশটা সবার। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হবে না।

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়েও দলের পরিকল্পনার কথা জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মহানগরীর ৩১টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী দিয়ে জয়ী হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।

জুলাই অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে গোলাম পরওয়ার বলেন, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, আনাস, মেহেদী হাসানসহ অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন। সহস্রাধিক মানুষের রক্ত, ৩০ হাজার মানুষের আহত শরীরের বিনিময়ে জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলাম। এই বাংলাদেশ আমরা চাইনি।

তিনি বলেন, ভিন্ন মতের ওপর দমন-পীড়ন হবে, দুর্নীতি হবে, লুটপাট হবে, চাঁদাবাজি হবে, আবার ক্যাম্পাসে সংঘাত হবে—এই বাংলাদেশের জন্য আমাদের সন্তানরা রক্ত দেয়নি।

তরুণদের উদ্দেশে গোলাম পরওয়ার বলেন, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা এই ব্যাধি, সমাজদেহে বাসা বাঁধা দুরারোগ্য রোগগুলোর বিরুদ্ধে আপনারা কি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রাজি আছেন।

অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগরীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, খুলনা মহানগরীর সেক্রেটারি ও খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল, জামায়াতে ইসলামীর যুব ও ক্রীড়া বিভাগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুহাম্মদ ইয়াসিন আরাফাত, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য ও খুলনা মহানগর সভাপতি মো. রাকিব হাসান এবং খুলনা মহানগরী যুব ও ক্রীড়া বিভাগের সভাপতি মুকাররম আনসারী বক্তব্য দেন।

বিষয় :