logo

পাথর আমদানিতে ধস, কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনে হাজারো শ্রমিক

পাথর আমদানিতে ধস, কাজ হারিয়ে মানবেতর জীবনে হাজারো শ্রমিক

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর এবং উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর এখন কার্যত সংকটের মুখে। ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল এই বন্দর মূলত পাথর আমদানির ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। তবে গত দুই বছরে পাথর আমদানিতে বড় ধরনের পতন ঘটায় বন্দরের কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই কমে গেছে।

আমদানিকারকদের অনীহা, ব্যাংকের এলসি–সংক্রান্ত জটিলতা এবং দেশের বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ ধীরগতিতে চলায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর সরাসরি প্রভাবে বন্দরের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে বুড়িমারী স্থলবন্দর অচিরেই ‘মৃত বন্দরে’ পরিণত হতে পারে।

একসময় এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ভারত ও ভুটান থেকে ৮০০ থেকে ৯০০ ট্রাক পাথর দেশে প্রবেশ করত। ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দ আর শ্রমিকদের ব্যস্ততায় দিনরাত সরগরম থাকত বন্দর এলাকা। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে দৈনিক ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাকে। বন্দরের ইয়ার্ডগুলো এখন প্রায় ফাঁকা, যেখানে আগে পাথরের স্তূপ জমে থাকত।

বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে একই সময়ে পাথর আমদানির পরিমাণ ছিল ২৪ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৯১ লাখ মেট্রিক টনে। তবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বড় ধাক্কা লাগে এলসি খোলার ক্ষেত্রে।

২০২৪ সালে যেখানে প্রায় এক হাজার এলসি খোলা হয়েছিল, ২০২৫ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৮০টিতে। এতে ভবিষ্যতে আমদানির পরিমাণ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, পাথর আমদানিতে এই ধসের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বড় মেগা প্রকল্প ও সরকারি উন্নয়নকাজ অনেক জায়গায় বন্ধ বা ধীরগতিতে চলছে। ফলে পাথরের চাহিদা কমে গেছে। দ্বিতীয়ত, ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো এলসি খোলায় অনীহা দেখাচ্ছে। এতে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকেরা ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছেন না। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে পাথরের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানির খরচ বেড়েছে। কিন্তু দেশীয় বাজারে সেই অনুযায়ী দাম না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।

বন্দর এলাকার শ্রমিক সর্দার রহিম মিয়া বলেন, আগে দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করা যেত। এখন সারাদিন অপেক্ষা করেও অনেক সময় একটি ট্রাকের কাজ মেলে না। অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো বা কৃষিকাজের দিকে ঝুঁকছেন, কিন্তু সেখানেও সুযোগ সীমিত। শ্রমিক পরিবারগুলো এখন ঋণের কিস্তি ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।

বুড়িমারী স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত চালুর আশ্বাস পাওয়া গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে সহযোগিতা না করায় ব্যবসা স্থবির হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়; সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাথর ছাড়াও কয়লা ও অন্যান্য পণ্যের আমদানিও কমে গেছে। ফলে কাস্টমস হাউসের দৈনন্দিন রাজস্ব আয় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বন্দরকে সচল রাখতে ব্যবসায়ীরা কয়েকটি দাবি তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—বন্ধ বা ধীরগতির মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত চালু করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া, আমদানিকৃত পাথরের ওপর শুল্ক পুনর্বিবেচনা এবং ভারতের চ্যাংরাবান্ধা ও ভুটানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাণিজ্য সহজীকরণে উদ্যোগ নেওয়া।

ভারতের ব্যবসায়ী রাজেন্দ্র দাস বলেন, বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি আবার সক্রিয় হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই উপকৃত হবেন। সীমান্ত বাণিজ্যের জটিলতা দূর করতে দুই দেশের সরকারের সমন্বয় প্রয়োজন।

বুড়িমারী স্থলবন্দরের উপকমিশনার মুহাম্মদ মহি উদ্দিন বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বন্দর এলাকায় বাণিজ্যিক পরিবেশ উন্নত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনে বন্দরটির আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম ও রাজস্ব আয় আরও বাড়বে।