logo

শতকোটি টাকার প্রকল্পে নদী রক্ষা অধরাই, নেই দৃশ্যমান উন্নতি

শতকোটি টাকার প্রকল্পে নদী রক্ষা অধরাই, নেই দৃশ্যমান উন্নতি

নদী রক্ষায় শতকোটি টাকার প্রকল্প কাগজে সফল হলেও বাস্তবে তার সুফল মিলছে না। ২০১৮ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালে শেষ হওয়া প্রায় ১০০ কোটি টাকার নদী ও খাল খনন প্রকল্প চার বছরের মধ্যেই কার্যত ব্যর্থ হয়ে পড়েছে। খননের পরও মানিকগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। পরিকল্পনার দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং নানা অনিয়মে পুরো প্রকল্প এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তিনটি নদী ধলেশ্বরী, ইছামতী ও গাজীখালী এবং ছয়টি খাল খননের কাজ করা হয়। এর আওতায় বানিয়াজুরী, উবাজানী, ঘোষবাড়ী, ঘড়িয়ালা, নালোরা, কাশাদহসহ আশপাশের নদী,খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার কথা ছিল।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, খননের পর অল্প সময়ের মধ্যেই নদীগুলো আবার ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও শুকনো মৌসুমে নদীর তলদেশে ফসল আবাদ হচ্ছে, আবার কোথাও হাঁটু পানিও নেই।

কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আফাজ উদ্দিন বলেন, এই গাজীখালী নদীতে আমরা আগে বারো মাস পানি দেখতাম। এখন বর্ষার তিন মাস বাদে নদীর বুকে ধান চাষ হচ্ছে। খনন হয়েছে, কিন্তু নদী ফিরে আসেনি এটাই এখন আমাদের প্রতিদিনের আক্ষেপ। আগে যেখানে পানি ছিল, এখন সেখানে ধুলো উড়ে।

ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী জাগীর ইউনিয়নের সেলিম উদ্দিন জানান, খননের কিছুদিন পরই নদীর তলদেশে আবার বালু জমে নতুন চর তৈরি হয়। অনেক জায়গায় নদীর বুকেই এখন ফসল ফলানো হচ্ছে।

উবাজানী এলাকার বাসিন্দা রসিদ মিয়া অভিযোগ করেন, তার বাড়ির পাশে কয়েক মাস ধরে খননযন্ত্র দিয়ে বালু তুলে বিক্রি করা হয়েছে। এতে একই স্থানে অতিরিক্ত গভীরতা তৈরি হয়েছে এবং বর্ষা এলেই নদীতীরে ভাঙন দেখা দিচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক জায়গায় নির্ধারিত গভীরতায় খনন না করে উপরিভাগেই কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। আবার খননকৃত মাটি নদীর পাড়ে ফেলে রাখা হয়, যা পরে বৃষ্টিতে আবার নদীতে ফিরে গেছে। প্রকল্প ঘিরে মাটি বাণিজ্য হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে।এছাড়া খননের মাটি আগাম নিলামে কিনে নেওয়া ব্যক্তিরাই শ্রমিক নিয়োগ করে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খননের দুই বছরের মধ্যেই ধলেশ্বরীর বিভিন্ন অংশে পলি জমে নদী প্রায় শুকিয়ে যায়। একই চিত্র কালীগঙ্গা নদীতেও। শুকনো মৌসুমে কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও সম্পূর্ণ শুকনো নদীর তলদেশ দেখা যায়। পরিবেশবাদী সংগঠন বারসিক তাদের এক প্রতিবেদনে এসব নদীকে “মৃতপ্রায়” হিসেবে উল্লেখ করেছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খনন করলেই নদী টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এমন প্রকল্প টেকসই হয় না দখলমুক্তকরণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ড্রেজিং এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে দেখা গেছে, নদীর তীর দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, অবাধে বালু উত্তোলন এবং খননের পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল নদী ভাঙন পানির প্রবাহ ঠিক রাখা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রতি বছরই এসব খাল এবং নদী ভরাট হয়ে পরিণত হচ্ছে কৃষি জমিতে।

মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান বলেন, উজানের পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক কারণও প্রকল্প ব্যর্থতার জন্য দায়ী। তবে বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খননের পরিকল্পনা নিয়েছে, যেখানে পুনঃখনন ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়া হয়েছে।