Advertisement

আগুনে জ্বলে, পানিতে ভাসে—হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কঞ্চনা বিলের মাটি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, নীলফামারী
আগুনে জ্বলে, পানিতে ভাসে—হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কঞ্চনা বিলের মাটি
হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় কঞ্চনা বিলের মাটি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আগুনে দিলে জ্বলে, আবার পানিতে ফেললে ভেসে থাকে। দেখতে সাধারণ মাটির মতো হলেও নীলফামারীর ডোমার উপজেলার কঞ্চনা বিলের মাটির এমনই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য। স্থানীয়দের কাছে বহুদিন ধরে পরিচিত এই মাটি মশা তাড়াতে কয়েলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শীতের সময় শুকনো মাটি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তাপও নেন স্থানীয়রা। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপরিকল্পিতভাবে মাটি সরিয়ে নেওয়া এবং বিলের জলাভূমি সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় প্রকৃতির এই বিস্ময়ও এখন অস্তিত্বের সংকটে।

Advertisement

স্থানীয়দের অভিযোগ, কঞ্চনা বিলের মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে মৃত্তিকা পরীক্ষায় এই মাটিতে উচ্চমাত্রার জৈব পদার্থ, নাইট্রোজেন, সালফার ও জিংকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা, এটি এক ধরনের কয়লা হতে পারে। মাটিটির বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

ডোমার উপজেলার হরিণচড়া ইউনিয়নের কঞ্চনা বিলের চারপাশে এখন আর আগের সেই বিশাল জলাভূমি দেখা যায় না। বছরের পর বছর জমি ভরাট ও দখলের কারণে বিলটির আয়তন কমেছে। বর্ষায় বিলের পানির সঙ্গে ভেসে ওঠে কালচে মাটি। শুকনো মৌসুমে আবার সেই মাটি ডুবে যায় বিলের তলদেশে।

বিলপাড়ের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম বলেন, কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা এই বিলের সঙ্গে পরিচিত। মাছ ধরার সময় পানির ওপর তেলের মতো একটি স্তর দেখা যেত। সেই মাটির কাছে আগুন নিলে হঠাৎ আগুন ধরে যেত।

তিনি বলেন, আগে আমরা এই বিলে মাছ ধরেছি। পানির ওপরে তেলের মতো কিছু ভেসে থাকত। আগুন নিয়্যা একটু নিচের দিকে গেলে ভেসে থাকা মাটির ওপরে হঠাৎ আগুন ধরে যেত।

স্থানীয় যুবক রায়হান সবুক্তগীন বলেন, কঞ্চনা বিলের মাটির বৈশিষ্ট্য সাধারণ মাটির মতো নয়। পানিতে ভাসার পাশাপাশি আগুনেও জ্বলে এই মাটি। তার ভাষ্য, খুবই অদ্ভুত ধরনের এখানকার মাটি। এগুলো পানিতেও ভাসে, আবার আগুনেও জ্বলে। অনেকে মশার কয়েলের মতো ব্যবহার করেন। শীতের সময় শুকনো মাটি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তাপও নেন।

স্থানীয়রা জানান, বর্ষায় বৃষ্টির পানি ও বিলের পানির চাপ বাড়লে মাটিগুলো আবার ওপরে উঠে আসে। শুকনো মৌসুমে তা নিচে নেমে যায়। মাছ চাষের জায়গা তৈরি করতে প্রতিবছর বিলের ওপরের মাটি সরিয়ে ফেলা হয়। তবে বর্ষা এলেই তলদেশ থেকে আবার ভেসে ওঠে সেই মাটি।

স্থানীয়দের দাবি, একসময় কঞ্চনা বিলের পরিধি ছিল অনেক বড়। বর্তমানে জলাভূমি সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বিলটি তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে। এর পাশাপাশি বিলের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।

রায়হান জানান, কঞ্চনা বিলের মাটি নিয়ে কৌতূহল থেকেই তিনি মৃত্তিকা পরীক্ষাগারে এর নমুনা পরীক্ষা করান। পরীক্ষায় মাটিতে অতি উচ্চমাত্রার জৈব পদার্থের পাশাপাশি নাইট্রোজেন, সালফার ও জিংকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

কঞ্চনা বিলের আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো এর ভেতরের চোরাবালি। স্থানীয় ভাষায় যাকে ‘ভূল’ বলা হয়। স্থানীয়দের দাবি, বিলের কিছু অংশে এমন জায়গা রয়েছে, যেখানে মানুষ বা গবাদিপশু আটকে যেতে পারে। ফলে অপরিচিত কেউ বিলের ভেতরে প্রবেশ করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এত বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও কঞ্চনা বিল ও এর মাটি সংরক্ষণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করলেও পরবর্তী সময়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি বলে দাবি তাদের।

এদিকে স্থানীয়দের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, বাইরের লোকজন ও প্রতিষ্ঠান এই মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, এখনই সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের এই মাটিও একসময় কঞ্চনা বিল থেকে হারিয়ে যেতে পারে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের আগে কঞ্চনা বিলে প্রায় ৮৪ বিঘা জলাভূমি খাস খতিয়ানে ছিল। ১৯৯০ সালে এর ৬৫ বিঘা জমি উঁচু জমি হিসেবে স্থানীয়দের কবুলিয়ত লিজ দেওয়ার পর বিলটির জলাভূমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৮ বিঘায়।

জলাভূমির এই সংকোচনের ফলে শুধু কঞ্চনা বিলের মাটির বৈশিষ্ট্যই নয়, বিলটির অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একদিকে কমছে জলাভূমির আয়তন, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। এর সঙ্গে অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের মাটির নির্বিচারে উত্তোলন চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কঞ্চনা বিল হয়তো শুধু গল্প হয়েই থাকবে।

নীলফামারীর জেলা প্রশাসক নায়িরুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে এটাকে আসলে এক প্রকার কয়লা বিবেচনা করা যেতে পারে। এই মাটির গুণাগুণ নিয়ে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবে জেলা প্রশাসন।