logo
Advertisement

শেরপুর/১১ কোটির কসাইখানায় যেতে চায় না কসাইরা

শাকিল মুরাদ
শেরপুর, ময়মনসিংহ
১১ কোটির কসাইখানায় যেতে চায় না কসাইরা
১১ কোটি টাকায় নির্মিত কসাইখানা পড়ে আছে অচল অবস্থায়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আধুনিক প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতের নানা সুবিধা—সবই আছে। নেই শুধু কার্যক্রম। প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শেরপুরের আধুনিক কসাইখানাটি উদ্বোধন ও হস্তান্তরের পরও পড়ে আছে অচল অবস্থায়। অথচ শহরের বিভিন্ন স্থানে আগের মতোই চলছে পশু জবাই ও মাংস বিক্রি।

জানা গেছে, ২০২৩ সালের শেষের দিকে শেরপুর পৌর শহরের দমদমা-কালীগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৫০ শতক জমির ওপর নির্মাণ শুরু করা হয় আধুনিক এই কসাইখানা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) আওতায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ১০ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপনাটি নির্মাণ শেষে ২০২৬ সালের জুনে পৌরসভাকে হস্তান্তর করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শহরের যত্রতত্র পশু জবাই বন্ধ করা, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবেশদূষণ কমানোই ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় পশু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াজাত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধাও রাখা হয়েছে এখানে। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও বাস্তবায়িত হয়নি সেই উদ্দেশ্য। পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে স্থাপনাটি হস্তান্তরের কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো সেখানে শুরু হয়নি পশু জবাই বা মাংস প্রক্রিয়াজাতের কার্যক্রম।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল জায়গাজুড়ে নির্মিত কসাইখানাটির অবকাঠামো অনেকটা নীরব-নিষ্ক্রিয়। যেখানে প্রতিদিন পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাত হওয়ার কথা, সেখানে নেই সেই কর্মচাঞ্চল্য। কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি কার্যত ব্যবহারহীন পড়ে রয়েছে। স্থাপনাটির ভেতরের যন্ত্রপাতিগুলো পড়ে আছে।

শেরপুরের আধুনিক কসাইখানা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
শেরপুরের আধুনিক কসাইখানা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কসাইদের অভিযোগ, শহরের বাজার থেকে গরু বা অন্যান্য পশু কসাইখানায় নিয়ে যেতে হবে। সেখানে জবাই শেষে মাংস আবার পরিবহন করে শহরের বাজারে আনতে হবে। এতে বাড়বে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয়ের চাপ পড়বে ক্রেতার ওপর। কারণ, স্থাপনাটি শহরের প্রধান বাজার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে।

কসাইরা জানান, আধুনিক কসাইখানা নির্মাণের আগে তাদের সাথে আলোচনা করা হয়নি। কোথায় স্থাপনাটি হলে ব্যবসায়ীরা সহজে ব্যবহার করতে পারবেন, পরিবহনব্যবস্থা কেমন হবে কিংবা কসাইদের বাড়তি খরচ কীভাবে কমানো যাবে—এসব বিষয়ে আগে থেকে আলোচনা হলে বর্তমান সংকট তৈরি হতো না। আধুনিক কসাইখানা প্রয়োজনীয় হলেও ব্যবসায়ীদের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে শুধু অবকাঠামো তৈরি করায় এখন সেটি ব্যবহারকারীবিহীন হয়ে পড়েছে।

চাপাতলী এলাকার কসাই সুরুজ আলী বলেন, কসাইখানাটা শহর থেইকা অনেক দূরে। গরু নিয়া ওইহানে যাইতে গাড়ি লাগবো, আবার জবাই করার পর মাংস বাজারে আনতে হইবো। দুইবার গাড়িভাড়া দিলে আমাগো খরচ তো বাড়বই। এই খরচ দিয়া ব্যবসা করা কঠিন হইয়া যাইবো।

একই এলাকার কসাই আব্দুল আলিম বলেন, আমাগো বেশিরভাগ কাস্টমার বাজারেই মাংস কিনতে চায়। অনেকে আবার নিজের চোখের সামনে গরু জবাই করাইয়া মাংস নেয়। এখন এত দূরে নিয়া জবাই কইরা আবার মাংস বাজারে আনলে ক্রেতাও ঝামেলায় পড়বো, আমরাও পড়মু। এসব মাংস বিক্রি করা কঠিন হয়ে যাবে আমাদের জন্য।

কসাই তাজুল বলেন, কসাইখানা বানানোর আগে আমাগো লগে যদি একবার কথা কইতো, তাইলে আমরা কইতাম কী সমস্যা হইতে পারে। জায়গাটা কইরা দিলেই তো হইবো না, আমাগো ব্যবসাটাও তো চালাইতে হইবো। এখন এত টাকা খরচ কইরা বানাইছে, কিন্তু কেউ ব্যবহারই করতেছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা রায়হান মিয়া বলেন, এত টাকা খরচ কইরা একটা ভবন বানাইছে, অথচ কোনো কামেই লাগতেছে না। এইডা দেইখা খারাপ লাগে। এভাবে ফালাইয়া রাখলে কয়েকদিন পর যন্ত্রপাতি নষ্ট হইবো। যেভাবেই হোক এটা চালু করা দরকার।

আরেক বাসিন্দা শাফিজল হক বলেন, আমরা তো চাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গায় গরু জবাই হউক। বাজারের মধ্যে যেখানে-সেখানে জবাই করলে রক্ত-বর্জ্য রাস্তায় পড়ে থাকে, পরিবেশও নষ্ট হয়। এই কসাইখানাটা যদি ঠিকমতো চালু হয়, তাইলে মানুষের জন্যই ভালো হইবো।

আরেক বাসিন্দা রহমত আলী বলেন, কসাইদেরও সমস্যা আছে, পৌরসভারও সমস্যা থাকতে পারে। সবাই আলোচনার মাধ্যমে একটা ব্যবস্থা করা দরকার। এভাবে তো আর ফালাইয়া রাখলে লাভ নাই। কসাইদের সুবিধা-অসুবিধা দেইখা যেভাবে চালু করা যায়, সেই ব্যবস্থা করা দরকার।

১১ কোটি টাকার আধুনিক কসাইখানা পড়ে আছে অচল অবস্থায়। ছবি: এশিয়া পোস্ট
১১ কোটি টাকার আধুনিক কসাইখানা পড়ে আছে অচল অবস্থায়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক কসাইখানাটি চালু হলে এর সুফল পাবেন ভোক্তা ও পরিবেশ—দুই পক্ষই। তারা বলছেন, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পশু জবাই করা হলে মাংসের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে পশুর রক্ত, বর্জ্য ও অন্যান্য উচ্ছিষ্ট পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ থাকায় পরিবেশদূষণও কমবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রেজওয়ানুল হক ভূঁইয়া বলেন, আধুনিক কসাইখানা চালু হলে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহের পাশাপাশি শহরের যত্রতত্র পশু জবাই বন্ধ করা সম্ভব হবে। পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শেরপুর পৌরসভার প্রশাসক আরিফা সিদ্দিকা বলেন, কসাইদের সাথে আলোচনা করে তাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। কসাইদের পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য সমস্যার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে আধুনিক কসাইখানাটি দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।