logo

‘গেমঘরে’ দালালের নির্যাতনে দুই যুবকের মৃত্যুর খবরও পায়নি পরিবার

‘গেমঘরে’ দালালের নির্যাতনে দুই যুবকের মৃত্যুর খবরও পায়নি পরিবার

লিবিয়ায় ‘গেমঘরে’ (দালালদের বন্দিশালা) নির্যাতনে নিহত হওয়া মাদারীপুরের দুই যুবকের পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে টাকা আদায় করেছিল দালালচক্র। তাদের দীর্ঘদিন ধরে বন্দিশালায় আটকে রেখে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হতো। টাকা দিতে দেরি হলে চালানো হতো নির্যাতন। এমনকি নির্যাতনের একপর্যায়ে তারা মারা গেলে সেই খবরও পরিবাররে কাছে গোপন করা হয়। মৃত্যুর কযেক দিন পর স্থানীয় দালাল পরিবারকে বিষয়টি জানায়।

মৃত দুই যুবক হলেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ জনারদন্দি এলাকার কালাম হাওলাদারের ছেলে ইলিয়াস হাওলাদার (২৫) এবং ডাসার উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বিনতিলুক এলাকার প্রয়াত সেকেন হাওলাদারের ছেলে ফারুক হাওলাদার (৩৫)।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় প্রায় তিন বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে গিয়েছিলেন ইলিয়াস। সেখান থেকে বাংলাদেশি এক দালালের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে গত বছরের আগস্টের শুরুতে কাতার থেকে দালালের সহযোগিতায় লিবিয়ায় পৌঁছান ইলিয়াস। সেখানকার একটি গেম ঘরে ইলিয়াসকে বন্দি রেখে শারীরিক ও অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কয়েক দফায় ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন দালাল চক্রের সদস্যরা। ২৩ মার্চ ওই গেম ঘরে দালালের নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে মারা যান ইলিয়াস। মৃত্যুর চার দিন পর গত বৃহস্পতিবার রাতে স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে ইলিয়াসের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।

রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে  ইলিয়াসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির বড় ছেলেকে হারিয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন ইলিয়াসের বাবা কালাম হাওলাদার ও মা রানু বেগম। ইলিয়াসের দুই বছর বয়সি এক ছেলে আছে। বাবা যে আর কখনও  ফিরবে না, সেটা বুঝতে পারছে না অবুঝ শিশুটি। ইলিয়াসের স্ত্রী বীথিও কাঁদছিলেন।

ইলিয়াসে হাওলাদারের বাবা কালাম হাওলাদার বলেন, ‘আমার দুই ছেলে। দুজনই কাতারে থাকত। ওখানেই ভালো ছিল। বড় ছেলে ইলিয়াস আমাদের কাউকে কিছু না জানিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়া যায়। লিবিয়াতে যাওয়ার পরে আমরা জানতে পারি। ছেলের মুখের দিকে চাইয়ে আমি অনেক কষ্ট করে ২০ লাখ টাকা দালাল হাবিব মাস্টারের কাছে দিই। তবুও আমার ছেলেটা মরে গেল।’

তিনি বলেন, ‘শুক্রবার ঢাকায় দালাল আমাদের নিয়ে বসেছে। তিনি আমার ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে এনে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্ষতিপূরণও দিবে বলেছেন। সেটা কবে দেবে, তা বলেননি।’

এদিকে ডাসার উপজেলার বিনতিলুক এলাকার ফারুক হাওলাদার লিবিয়ার বন্দিশালায় দালালের নির্যাতনে মারা গেছেন ১৮ মার্চ। পরিবার ফারুকের মৃত্যুর খবর পেয়েছে ২৫ মার্চ। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ফারুক রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি উন্নত জীবনের আশায় চার মাস আগে স্থানীয় দালাল হাবিবুর রহমানের মাধ্যমে সৌদি আরব হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান। পরে তাকে একটি গেমঘরে আটক রেখে তার পরিবারের কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। তাকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে নেওয়ার কথা থাকলেও নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে দাবি পরিবারের।

লিবিয়াতে দালালের নির্যাতনে ছেলে ফারুক হাওলাদারের মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছেন না মা মালেকা বেগম। ডাসার উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বিনতিলুক গ্রামের ফারুকের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, কান্নার আহাজারি। মা মালেকা বেগম, স্ত্রী লাবণী আক্তার ছাড়াও ফারুকের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে আছে। ফারুকের এমন মৃত্যুতে তার পরিবারসহ প্রতিবেশীরাও শোকাহত। 

ফারুকের মা মালেকা বেগম বলেন, ‘গেমঘর আমি বুঝি না। আমার ছেলেরে একটা ঘরের ভেতরে আটকে ওরা মারতে মারতে না খাওয়াইয়া মাইরা ফালাইছে। ওর ছোট্ট দুই ছেলেমেয়ে, ওরাও অবুঝ। ওগের কী হবে? কে দেখবে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কেউ রইল না।’

ফারুকের ফারুকের চাচাতো ভাই আহসান  বলেন, ‘দালাল বলেছে, লাশ এনে দিবে। তারপর তার বিচার চামু। এখন বিচার চাইতে গেলে লাশ দালালে আইনা দিবে না। তাই আমরা আপাতত থানা-পুলিশ কিছু করতেছি না।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাবিব মাস্টার ওরফে হাবিবুর রহমান খন্দকারের বাড়ি ডাসার উপজেলার গোপালপুর এলাকায়। তিনি একটি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষক। তিনি বাংলাদেশে থেকে লিবিয়ার মানব পাচার চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছেন। দীর্ঘ দিন ধরে এই পেশায় জড়িত থাকলেও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। কালকিনি ও ডাসার উপজেলা থেকে অন্তত চার শতাধিক যুবককে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে পাঠিয়েছেন হাবিব। এখনও লিবিয়ার বন্দিশালায় তার অন্তত শতাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী আছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য হাবিবুর রহমান খন্দকারের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, লিবিয়ায় দালালের বন্দিশালায় দুই যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার থানায় অভিযোগ দিলে মামলা নেওয়া হবে।