
পিরোজপুরে ডেঙ্গু সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। গত নয় মাসে জেলার সদর হাসপাতালসহ সাতটি উপজেলায় ৩ হাজার ৪১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৭১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে বরিশাল বিভাগের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে অবস্থান করছে পিরোজপুর। ১০০ শয্যার পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের সীমিত জায়গার কারণে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন এই হাসপাতালে। এছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যায় বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পার্শ্ববর্তী ঝালকাঠি জেলা।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৭১ জন ডেঙ্গু রোগী পিরোজপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ৫৯ জন, নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৭ জন, নেছারাবাদে ৩৫ জন, কাউখালীতে ১০ জন, ভান্ডারিয়ায় ৩২ জন, মঠবাড়িয়ায় ২ জন ও জিয়ানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পিরোজপুরে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ৮৬৩ জন। বর্তমানে জেলার হাসপাতালগুলোতে ১৭৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জিয়ানগরের পত্তাশী গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন মো. জুয়েল বলেন, প্রায় ১৫ দিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তার মা অসুস্থতায় ভুগছেন। প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়নি। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এরপর তাকে ভালো সেবা দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এখন ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছেন তিনি।
পিরোজপুর শহরের শেখবাড়ি এলাকার বাসিন্দা তানভীর নামে এক তরুণ বলেন, এখানে চিকিৎসা খুবই নিম্নমানের। মশারির ভেতরেও তেলাপোকা দৌড়ায়। ডাক্তার ঠিকমতো আসেন না। ডেঙ্গু কর্নারের মধ্যে ময়লা ও পোকা দৌড়াচ্ছে। তিনি প্রায় চার দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। বর্তমানে কিছুটা সুস্থ হয়েছেন।
চিকিৎসা নিতে আসা পার্শ্ববর্তী কচুয়া উপজেলার মড়িয়া ইউনিয়নের চসনগর গ্রামের বাসিন্দা মো. সোহেল রানা বলেন, বাড়িতে থাকা অবস্থায় তার মায়ের প্রথমে অল্প করে জ্বর আসছিল। তখন তারা বুঝতে পারেননি। পরে বেশি সমস্যা দেখা দিলে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। রক্ত পরীক্ষা করার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তিনি তিন-চার দিন ধরে হাসপাতালে আছেন। এখন মোটামুটি ভালো আছেন। তবে ডাক্তার আবারও দুটি পরীক্ষা দিয়েছেন।
পিরোজপুর শহরের মাছিমপুর এলাকার বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী এক নারী সাহানা বেগম বলেন, বাড়ি থেকে ঢাকায় যাওয়ার দুদিন পর তার অনেক জ্বর আসে। তখন চার দিন বাসায় ছিলেন। ঢাকায় চিকিৎসা করা সম্ভব না হওয়ায় পরে বাড়িতে এসে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখানে আসার পর তাকে স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। এখনো তার শরীর খুব দুর্বল। মুখে ইনফেকশন হওয়ায় খাবার খেতে পারছেন না।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সুরঞ্জিত কুমার সাহা বলেন, দক্ষিণ অঞ্চলের মধ্যে পিরোজপুরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। মনে হচ্ছে যেন কমছেই না, দিন দিন বেড়েই চলছে এ সংখ্যা। যারা চিকিৎসা নিতে আসছেন, তাদের ভোগান্তি আছেই এবং তারা অনেক রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন। সবাইকে সচেতন হতে হবে। এছাড়া বের হওয়ার কোনো পথ নেই।
তিনি বলেন, মশারি ব্যবহার করতে হবে। মশা প্রতিরোধে কিছু কেমিক্যাল আছে, সেগুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে। বাড়ির পাশে বদ্ধ পানি থাকলে সেই পানি যেন জমে থাকতে না পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, বদ্ধ পানিতে এডিস মশার জন্ম হয় এবং এরা ডেঙ্গু বহন করে। এজন্য এই মশা যেন জন্মাতে না পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নিজাম উদ্দিন বলেন, তাদের এখানে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় পর্যাপ্ত লজিস্টিক, জনবল ও ওষুধ রয়েছে। তারা সফলভাবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করছেন। তাদের এখানে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিনশ রোগী ভর্তি থাকেন। তাই সব রোগী সামাল দিতে গিয়ে একটু হিমশিম খেতে হচ্ছে। জেলা হাসপাতালের নতুন ভবনের প্রায় কাজ শেষ। কর্তৃপক্ষ ভবনটি তাদের কাছে হস্তান্তর করলে পরিপূর্ণভাবে কাজ সম্প্রসারিত করা হবে।
পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, এই জেলায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। জেলা প্রশাসন, তথ্য অধিদপ্তর, পৌরসভা ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার রয়েছে। তাদের সঙ্গে সচেতনতামূলক সভা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। জেলার হাসপাতালগুলোতে রোগীদের স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে হাসপাতালের আশপাশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জেলার বিভিন্ন বাড়িতে তারা পরিদর্শন করেছেন। বেশিরভাগ বাড়িতে নারিকেল ও সুপারি গাছ রয়েছে। এসব গাছ কাটার পর গোড়ায় পানি জমে থাকে। নারিকেল গাছের খোলসের মধ্যেও পানি জমে থাকে। সেখান থেকে ডেঙ্গুর লার্ভা উৎপন্ন হয়। পাশাপাশি বাড়ির পাশে নালা তৈরি করে সেখানে সবজি চাষ করা হয়, সেখানেও পানি জমে ডেঙ্গুর লার্ভা উৎপন্ন হয়।
মতিউর রহমান বলেন, পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ ও কচুয়ার বিভিন্ন এলাকার মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবার সহযোগিতা চাই। সবাই সচেতন হলে ডেঙ্গু থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব, ইনশাআল্লাহ।