Advertisement

জোড়াতালিতে চলছে পাটুরিয়া ফেরিঘাট, বর্ষায় বাড়ছে শঙ্কা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
জোড়াতালিতে চলছে পাটুরিয়া ফেরিঘাট, বর্ষায় বাড়ছে শঙ্কা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুট। ২০০২ সালে আরিচা থেকে পাটুরিয়ায় ফেরিঘাট স্থানান্তরের পর এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার যানবাহন এবং হাজারও যাত্রী এই পথে পারাপার হন। পদ্মা সেতু চালুর পর চাপ কিছুটা কমলেও নৌপথটির প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়ে গেছে।

Advertisement

তবে গত বর্ষার ভয়াবহ ভাঙনের পরও স্থায়ী কোনো সমাধান নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নতুন বর্ষা সামনে রেখে ফের একই ঝুঁকিতে রয়েছে পাটুরিয়া ফেরিঘাট ও আশপাশের এলাকা।

গত বছরের ৫ আগস্ট পদ্মার তীব্র স্রোতে পাটুরিয়া লঞ্চঘাট পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। পাশাপাশি নদীগর্ভে তলিয়ে যায় পাঁচটি বসতঘর ও একটি মুরগির খামার। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ফেরিঘাট। ওই সময় একাধিকবার ঘাটের র‌্যাম্প পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন ওঠানামা ব্যাহত হয় এবং পারাপারে দীর্ঘ বিলম্ব সৃষ্টি হয়।

ভাঙনের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও স্থায়ী সংস্কার হয়নি। আপাতত জোড়াতালি দিয়ে ঘাটগুলো সচল রাখা হয়েছে। এতে প্রতিদিনই ভোগান্তি বাড়ছে। ফেরিতে ওঠানামার সময় যানবাহন আটকে যাচ্ছে, কোথাও মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে পারাপারের সময় বাড়ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।

সম্প্রতি সরেজমিন দেখা গেছে, নদীর পানি কমে যাওয়ায় পন্টুন নিচে নামানো হয়েছে। এতে ঘাটের সঙ্গে সংযোগ সড়কের ঢাল অস্বাভাবিকভাবে খাড়া হয়ে গেছে। ভারী যানবাহন ফেরি থেকে ওঠার সময় মাঝপথে থেমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রেকার দিয়ে টেনে তুলতে হচ্ছে। এতে চালক ও যাত্রীদের জন্য বাড়ছে ঝুঁকি।

এই ঝুঁকির চিত্র স্পষ্ট হয় গত ১১ মার্চ রাতে। পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাটে ফেরি থেকে নামতে গিয়ে একটি তেলবাহী লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। প্রায় ১৬ ঘণ্টা পর উদ্ধারকারী জাহাজ দিয়ে সেটি তোলা সম্ভব হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাড়া সংযোগ সড়কই এ ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

চালক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই ভাঙন দেখা দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘাট। কিন্তু স্থায়ী কোনো বাঁধ বা টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করা হয় না। অস্থায়ী সংস্কারের ওপর নির্ভর করেই চলছে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ।

পাটুরিয়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর মাত্র তিন সপ্তাহের ভাঙনেই লঞ্চঘাটসহ কয়েকটি স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এবারও আগাম কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একইভাবে ভাঙন শুরু হলে পুরো ফেরিঘাট ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

কুষ্টিয়াগামী ট্রাকচালক মহিদুর রহমান বলেন, এই পথে সময় ও খরচ দুটোই কম হয়। তবে বর্তমান অবস্থায় ফেরিতে ওঠানামার সময় ভয় কাজ করে। গত বছরের মতো ভোগান্তির আশঙ্কা এখনও রয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয়ের ডিজিএম আব্দুস সালাম বলেন, গত বছর সব ঘাটই কমবেশি ভাঙনের শিকার হয়েছিল। এবারও একই পরিস্থিতি হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে। স্থায়ী নদীশাসন ছাড়া এই নৌপথ টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।

বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা নদীবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল আলম জানান, ঘাটের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, মূল সমস্যা নদীশাসনের অভাব। কেবল ঘাট মেরামত করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আপাতত ফেরি চলাচল সচল রাখতে নতুন অ্যাপ্রোচ সড়ক তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, ফেরিঘাট এলাকা তাদের কর্মপরিধির বাইরে। তবে জেলার অন্য নদীগুলোর ভাঙনরোধে কাজ চলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাটুরিয়া ফেরিঘাটের দীর্ঘদিনের এই সংকট সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। স্থায়ী নদীশাসন, টেকসই ঘাট নির্মাণ এবং আধুনিক সংযোগ সড়ক গড়ে তোলা না গেলে প্রতিবছরই একই ভাঙন, ঝুঁকি ও ভোগান্তি ফিরে আসবে।