logo

তিন দিন ধরে বিদ্যুৎহীন শেরপুরের ৬০ গ্রামের মানুষ

তিন দিন ধরে বিদ্যুৎহীন শেরপুরের ৬০ গ্রামের মানুষ

টানা চার দিনের কালবৈশাখী, থেমে থেমে ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতে শেরপুর জেলার প্রায় সব উপজেলায় মারাত্মক বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ঝড়ে গাছের ডালপালা ভেঙে বৈদ্যুতিক লাইনের ওপর পড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি গ্রামের মানুষ টানা ৭২ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানান, গত ২৫ এপ্রিল রাত থেকে শুরু হওয়া ঝড়বৃষ্টি ও বজ্রপাতের পর থেকেই বিশেষ করে পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক এলাকায় টানা ৮০ থেকে ৯৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ নেই। এসব এলাকার বেশিরভাগ সংযোগ পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঝিনাইগাতী উপজেলার নওকুচি, গান্ধিগাঁও, সন্ধ্যাকুড়া, হালচাটি, কালিবাড়ি, তাওয়াকুচা, দারিয়াপাড়া, কুচনিপাড়া ও হালুয়াহাটি গ্রামসহ বহু এলাকায় তিন থেকে চার দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। একই চিত্র শ্রীবরদী উপজেলার রানিশিমুল, সিংগাবরুনা ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রাম, কাকিলাকুড়া ও তাতিহাটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায়।

অন্যদিকে নালিতাবাড়ী উপজেলার বাতকুচি, খলচন্দা, কাটাবাড়ী, বারোমারী, নন্নী, পাঁচগাঁও ও যোগানিয়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যানদের দেখা মিলছে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন দ্রুত মেরামত না হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। স্বাভাবিক সময়েও যেখানে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে, সেখানে ঝড়ের কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলার হালচাটি গ্রামের ওমর ফারুক বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ফসল রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। মোবাইল চার্জ দিতে পারছি না, নেটওয়ার্কও নেই। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আমাদের এলাকায় ৯৬ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ নেই। এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও পড়াশোনা করতে পারছে না।

একই উপজেলার দারিয়াপাড়া এলাকার আতিক আকন্দ বলেন, তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। কোনো কাজই করতে পারছি না। দ্রুত বিদ্যুৎ চালুর দাবি জানাই।

শ্রীবরদী উপজেলার বালিঝুড়ি কালিবাড়ি এলাকার কাদির মিয়া বলেন, স্বাভাবিক সময়েও বিদ্যুৎ কম থাকে। তার ওপর ঝড়ের কারণে তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। মোবাইল চার্জ দিতে পারছি না, সব কাজ বন্ধ হয়ে আছে।

শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা এলাকার এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমন মিয়া বলে, বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। পরীক্ষার সময় এটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নালিতাবাড়ী উপজেলার বাতকুচি এলাকার নজরুল মিয়া বলেন, আমরা পাহাড়ি এলাকায় থাকি। হাতির সঙ্গে লড়াই করে ফসল ফলাতে হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। চার দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের শ্রীবরদী উপজেলার ডিজিএম প্রকৌশলী সূর্য নারায়ণ ভৌমিক বলেন, অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ চালু রয়েছে, তবে কিছু এলাকায় এখনো বন্ধ আছে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে বারবার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের সীমিত জনবল দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলার সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (ওঅ্যান্ডএম) জহুরুল ইসলাম বলেন, বেশির ভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ চালু হয়েছে, তবে কিছু এলাকায় এখনও কাজ চলছে।

শেরপুর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. মাইনউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ নেই, তবে তা সীমিত পরিসরে। শ্রীবরদী উপজেলায় মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, ঝিনাইগাতীর পাহাড়ি এলাকায় বন্যহাতির ঝুঁকির কারণে প্রশাসনের নির্দেশে কিছু স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল-আমীন বলেন, ঝড়বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ নেই। পল্লী বিদ্যুতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়েছে, তারা কাজ করছে।

শ্রীবরদীর ইউএনও মনীষা আহমেদ বলেন, পল্লী বিদ্যুতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। সমস্যার দ্রুত সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

শেরপুর জেলায় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতায় প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার গ্রাহক রয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কৃষি, শিক্ষা ও সাধারণ জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।