logo

খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল/দুই বছর ঠায় দাঁড়িয়ে আধুনিক ভবন, চালু হয়নি চিকিৎসা কার্যক্রম

মাসুম বিল্লাহ ইমরান
খুলনা
দুই বছর ঠায় দাঁড়িয়ে আধুনিক ভবন, চালু হয়নি চিকিৎসা কার্যক্রম
খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল। খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কের পাশে। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আধুনিক কাঠামোর পাঁচতলা ভবন। একেবারে নতুন, দেখতে চোখ জুড়ানো। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কথা ছিল সেখানে দেওয়া হবে শিশুদের চিকিৎসাসেবা। নির্মাণ শেষ হয়েছে দুই বছর পার হয়ে গেছে। জনবল সংকটে শুরু হয়নি চিকিৎসা কার্যক্রম।

ভবনটি নির্মাণ করা হয় খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতালের জন্য। কাজ শেষে সেখানে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। ভেতরে রয়েছে সড়ক, সাব স্টেশন ও পাম্প হাউসসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা।

খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা বাইপাস সড়কের পাশে কেডিএর ময়ূরী আবাসিক এলাকা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যবর্তী এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে হাসপাতালটি।

সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের ভেতর সুনসান নীরবতা। বাইরে আগাছায় ঢেকে যাচ্ছে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের একাংশ। বিশেষায়িত এই স্বাস্থ্য অবকাঠামো পড়ে আছে কার্যত নিষ্ক্রিয়।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. শাহিনূর আক্তার বলেন, নির্মাণ শেষ হওয়ার দুই বছরের বেশি সময়েও চিকিৎসাসেবা শুরু না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি শুধু একটি ভবন অব্যবহৃত পড়ে থাকার বিষয় নয়; জনগণের অর্থে নির্মিত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর অকার্যকর ব্যবহার, মানুষের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ হারানোর উদাহরণ। এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের প্রশ্নও তৈরি করছে।

তিনি বলেন, একটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর রোগীর চাপ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়াকে নয়, চিকিৎসাসেবা শুরু হওয়াকে প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ২০১৯ সালে প্রায় চার দশমিক ৮০ একর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ৫২ কোটি দুই লাখ টাকা। এরপর ২০২০ সালে হাসপাতালের বেজমেন্ট ও একতলা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ের কাজে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৬ কোটি টাকা। পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম তলা নির্মাণ, রান্নাঘর, সাবস্টেশন, পাম্প হাউজ, সড়ক, ড্রেন ও গভীর নলকূপসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়।

জমি অধিগ্রহণসহ প্রকল্পের প্রথম ধাপে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। এ ধাপে পাঁচতলা পর্যন্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। পূর্ণ প্রকল্পে ভবনটি ১০ তলা করে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিশু রোগীদের চাপ সামলাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগসহ অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানকে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালটি ব্যবহার না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও কেন দুই বছর ধরে হাসপাতালটি চালু করা গেল না।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব আইনজীবী মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, একটি বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল দুই বছরেও চালু না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। ভৌত অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে স্বাস্থ্য বিভাগ ভবনটি বুঝে নিতে পারেনি এবং চিকিৎসা সেবাও শুরু করা সম্ভব হয়নি। এটি শুধু খুলনা নয়, বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষের চিকিৎসাসেবার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা হলে এতদিন প্রকল্পটি ঝুলে থাকার কথা নয়। এখানে ধীরগতি ও কর্তব্যে অবহেলার বিষয়টি স্পষ্ট।

খুলনা বিভাগীয় ‍শিশু হাসপাতাল। ছবি: এশিয়া পোস্ট
খুলনা বিভাগীয় ‍শিশু হাসপাতাল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তর খুলনা-১-এর সূত্র জানায়, প্রথমে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ দেখানো হয়।

গণপূর্ত বিভাগ খুলনা-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান বলেন, হাসপাতালটি খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জুলাইয়ে হাসপাতালটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশেষায়িত’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বলা হয়েছিল, খুলনা ও বরিশালের ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল দুটি আগস্টের প্রথম দিকে চালুর জন্য প্রস্তুত রয়েছে। জুলাইয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম পৌঁছানোর কথাও বলা হয়েছিল। তবে ঘোষিত নির্ধারিত সময়ে তা চালু হয়নি।

খুলনা শিশু হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রদীপ দেবনাথ বলেন, শিশু রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। আমাদের ২৭৫ শয্যার হাসপাতাল রোগীর চাপে পূর্ণ থাকে। অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অক্টোবরের মধ্যে বিভাগীয় সরকারি শিশু হাসপাতালটি চালু করা হবে। হাসপাতালটি চালু হলে শিশু চিকিৎসার ক্ষেত্রে খুলনার মানুষের ভোগান্তি অনেকটা কমবে।

এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, এটি অত্যন্ত হতাশাজনক এবং প্রশাসনিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ একটি হাসপাতাল নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য শুধু ভবন তৈরি করা নয়, মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। ভবন প্রস্তুত থাকার পরও দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসাসেবা শুরু না হলে কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রত্যাশিত জনকল্যাণমূলক সুফল পাওয়া যায় না।

মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার শিশুদের জন্য একটি সরকারি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালটি প্রস্তুত থাকার পরও সেখানে সেবা শুরু না হওয়ার অর্থ হলো যে চিকিৎসাসুবিধা জনগণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, বাস্তবে শিশুরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোশাররফ হোসেন বলেন, খুলনায় একটি বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল অত্যন্ত প্রয়োজন। হাসপাতালটিতে এখনো প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। জনবল নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালটি চালু করা হবে।

তিনি বলেন, হাসপাতালটি চালু হলে খুলনা বিভাগের শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। হাসপাতালটি চালুর জন্য নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর জনবল নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটি চালু করা সম্ভব হবে।