পাইকগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সপ্তাহে ৬ দিন বন্ধ ওটি, বিপাকে প্রসূতিরা

খুলনার পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসকের সংকটে সপ্তাহের ছয় দিনই বন্ধ থাকছে অপারেশন থিয়েটার (ওটি)। ফলে জরুরি অস্ত্রোপচার ও প্রসূতিদের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করানো সম্ভব হচ্ছে না। জটিল অবস্থায় রোগীদের প্রায় ৬৬ কিলোমিটার দূরে খুলনা নগরের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, পাশাপাশি জরুরি সময়ে রোগীর জীবনও পড়ছে ঝুঁকিতে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক হিসেবে পদায়িত আছেন ডা. জহিরুল ইসলাম। তবে সংযুক্তিতে তিনি সপ্তাহের চার দিন ফুলতলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং এক দিন কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করেন। পাইকগাছায় তার দায়িত্ব রয়েছে সপ্তাহে মাত্র এক দিন। ফলে ওই দিন ছাড়া বাকি ছয় দিন হাসপাতালে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ থাকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, প্রতিদিনই অস্ত্রোপচারের জন্য রোগী আসেন। বিশেষ করে প্রসূতিদের জরুরি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলেও অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় তাদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে প্রসূতি বিভাগে ১৫৫ জন রোগী ভর্তি হন। তাদের মধ্যে ১৯ জনের স্বাভাবিক প্রসব এবং ১১ জনের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার হয়েছে। চলতি আগস্টের ২৪ তারিখ পর্যন্ত ১২৫ জন প্রসূতি ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৫ জনের স্বাভাবিক প্রসব এবং আটজনের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার হয়েছে। জরুরি বিভাগেও রয়েছে রোগীর চাপ। গত জুলাই মাসে জরুরি বিভাগে ১ হাজার ৬৯৭ জন রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি আগস্টের ২৪ তারিখ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪১৫ জন। এ সময়ে দৈনিক গড়ে ৫৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসকের সংকট দেখা দেওয়ার আগে হাসপাতালে প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ৩০টি অস্ত্রোপচার হতো। বর্তমানে অস্ত্রোপচারের সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
হাসপাতালে ভর্তি প্রসূতি আরিফা বেগম উপজেলার প্রত্যন্ত কাঠামারী গ্রাম থেকে এসেছেন। তিনি জানান, কয়েক দিনের মধ্যে তার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য সময়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পেরেছেন, এখানে সপ্তাহে মাত্র এক দিন অস্ত্রোপচার হয়। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে কী করবেন, তা নিয়ে তিনি ও তার স্বজনেরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বাইরে অস্ত্রোপচার করাতে গেলে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে।
আরেক প্রসূতি আসমানী জানান, তার স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। তবে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি ও তার পরিবার চিন্তিত ছিলেন। তার ভাষ্য, বাইরে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করানোর মতো সামর্থ্য তাদের নেই। সরকারি হাসপাতালে অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় দরিদ্র পরিবারের মানুষ বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সাকিলা আফরোজ বলেন, প্রতিদিনই হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের জন্য রোগী আসেন। কিন্তু অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় তাদের নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক ডা. জহিরুল ইসলাম জানান, প্রায় আড়াই বছর ধরে তিনি পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তার স্ত্রী ও সন্তান অসুস্থ। স্ত্রী শয্যাশায়ী হওয়ায় দূরে গিয়ে দায়িত্ব পালন করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে খুলনা শহরের কাছাকাছি থাকার জন্য তিনি পরিচালকের কাছে আবেদন করেছিলেন। মানবিক দিক বিবেচনায় তার আবেদন অনুমোদন করা হয়। এরপরও তাকে পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সপ্তাহে এক দিন করে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানারা বিনতে আহমেদ জানান, অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসকের ঘাটতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। পাইকগাছা হাসপাতালে সার্বক্ষণিক একজন অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক দ্রুত পদায়ন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।



