গোপালগঞ্জের সুনীল গাঙ্গুলী নিজেই যেন এক চলমান পাঠাগার

বয়স ৭৮ ছুঁইছুঁই। বয়সের ভার শরীরে পড়লেও থেমে নেই পথচলা। এক হাতে বেতের লাঠি, কাঁধে বইভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটে বিনামূল্যে মানুষের হাতে তুলে দেন বই। এরপর খাতায় লিখে রাখেন—কোন বাড়িতে কোন বই দেওয়া হলো, আর কার কাছ থেকে কবে ফেরত আনতে হবে। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের সংগ্রহের বই এভাবে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছেন এই প্রবীণ শিক্ষক।
বলছি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের কুমরিয়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুনীল কুমার গাঙ্গুলীর কথা। তবে এলাকায় তিনি নিজের নামের চেয়ে বেশি পরিচিত ‘জ্ঞানের ফেরিওয়ালা’ হিসেবে।
পাঠকের বয়স ও আগ্রহ বুঝে বই নির্বাচন করেন সুনীল গাঙ্গুলী। শিশুদের জন্য রূপকথা ও গল্পের বই, শিক্ষার্থীদের জন্য মনীষীদের জীবনী, ইতিহাস ও জ্ঞানভিত্তিক বই, আর বয়স্কদের জন্য থাকে ধর্মীয় গ্রন্থ। কয়েক দিন পর পর আবার সেই বাড়িগুলোতে ফিরে গিয়ে বইগুলো সংগ্রহ করেন এবং পাঠকদের হাতে তুলে দেন নতুন আরেকটি বই। এভাবেই তার সংগ্রহের বইগুলো ঘুরে বেড়ায় এক হাত থেকে অন্য হাতে।
সুনীল গাঙ্গুলী একসময় নিজের বাড়ির পাশেই গড়ে তুলেছিলেন ‘চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগার’। প্রায় ছয় শতাধিক বইয়ের সেই পাঠাগারের নাম তিনি রেখেছিলেন নিজের পুত্রবধূ চন্দ্রিকার নামে। তার বিশ্বাস, তিনি না থাকলেও পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম যেন বই পড়ার এই উদ্যোগ ও পাঠাগারটি আগলে রাখে। তবে দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাব ও অর্থসংকটে ছোট্ট টিনের সেই পাঠাগারটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু থেমে নেই তার উদ্যোগ। পাঠাগারের বইগুলোই এখন প্রতিদিন ব্যাগে ভরে মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন তিনি।
ডিজিটাল যুগে যখন মোবাইল ফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের অবসরের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে, তখন গোপালগঞ্জের এই প্রবীণ শিক্ষক এখনও বিশ্বাস করেন, একটি ভালো বই একজন মানুষের চিন্তা বদলে দিতে পারে, আর একজন সচেতন মানুষ বদলে দিতে পারে একটি সমাজ।
সুনীল কুমার গাঙ্গুলী বলেন, গ্রামের মানুষ বই পড়ুক, নতুন কিছু জানুক, সচেতন হোক—এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া। যতদিন শরীরে শক্তি থাকবে, ততদিন মানুষের বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দিতে চাই।






