logo

পাহাড়ে আধিপত্যের লড়াইয়ে জিম্মি সাধারণ মানুষ, ঝুঁকিতে পর্যটনশিল্প

পাহাড়ে আধিপত্যের লড়াইয়ে জিম্মি সাধারণ মানুষ, ঝুঁকিতে পর্যটনশিল্প
অবরোধে পর্যটক ও স্থানীয়দের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করে যৌথ বাহিনী। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বারবার সংঘাত, অবরোধ ও অস্থিরতার অভিযোগ উঠছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনশিল্পে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে সাজেকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় পর্যটক হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সংগঠনকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। এরপরও পর্যটন মৌসুম এলেই বাড়ে তাদের চাঁদা ও ভাগ-বাটোয়ারার চাপ। এতে একদিকে যেমন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে পাহাড়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. আসাদ উল্লাহ এশিয়া পোস্টকে বলেন, পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে পাহাড়ে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

খাগড়াছড়ি হোটেল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মীর হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, পর্যটন মৌসুমে অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতিবছর বিভিন্ন সংগঠনকে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। এরপরও পর্যটন মৌসুমে তাদের চাহিদা বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে হোটেল-মোটেলসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ও এফঅ্যান্ডএফ রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী উজ্জ্বল দে এশিয়া পোস্টকে বলেন, পর্যটন মৌসুমে সাজেকসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুরো খাগড়াছড়ির পর্যটন খাতে। বাইরের পর্যটকেরা এখানে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পর্যটনসংশ্লিষ্ট চালক ও সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাহাড়ে সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা বন্ধ করে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।

খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য এশিয়া পোস্টকে বলেন, সাজেককে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়িতেও পর্যটনশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। কিন্তু পর্যটন মৌসুম এলেই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সংগঠনের অবরোধ ও নানা কর্মসূচিতে অস্থিরতা তৈরি হয়। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দায়ী করে। কিন্তু এসব ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা খুঁজে বের করে প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন করা জরুরি।

এদিকে সাজেকে চলমান অবরোধের পেছনে ইউপিডিএফের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা। তবে ভিডিও বার্তায় ইউপিডিএফের সংগঠক মাইকেল চাকমা দাবি করেন, বর্তমানে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য তাদের সংগঠন দায়ী নয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া এবং পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় বারবার সংঘাত ও অবরোধের কারণে সম্ভাবনাময় পার্বত্য পর্যটনশিল্প বড় ধরনের সংকটের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনের শঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় সাজেকের অবরোধ ও সংঘাতের নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এ বিষয়ে আইএসপিআর বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, সাজেকে অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় জনগণকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অবরোধে অংশ নিতে বাধ্য করা এবং মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইএসপিআর জানায়, এ ধরনের সহিংসতা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা ও পর্যটনশিল্পের জন্য হুমকিস্বরূপ। এতে পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা এবং জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড বন্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভূত সাজেক সমস্যার দ্রুত সমাধান চেয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া। শনিবার সকালে রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের মাইনি হলরুমে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।