গোপালগঞ্জ/এশিয়া পোস্টে সংবাদ প্রকাশের পর স্কুল পরিদর্শনে পুলিশ সুপার

নিজের অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের কষ্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে গ্রামের মেয়েদের জন্য গড়ে তোলা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার ‘কুমারী রেখা রানী গার্লস হাই স্কুল’ নিয়ে এশিয়া পোস্ট-এ সংবাদ প্রকাশের পর বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন গোপালগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের বুড়ুয়া গ্রামে অবস্থিত বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যান তিনি।
এ সময় গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী হুমায়ুন রশিদ, সহকারী পুলিশ সুপার (শিক্ষানবিস) রনি হাওলাদার, কোটালীপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রিয়াদ মাহমুদসহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে পুলিশ সুপার বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, একাডেমিক ভবন ও শিক্ষা কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠাতা কুমারী রেখা রানী ওঝা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা ও দীর্ঘদিনের নানা সমস্যার খোঁজখবর নেন।
বিদ্যালয়টি এখনো এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে পুলিশ সুপারকে জানানো হয়। পরে বিদ্যালয়টি দ্রুত এমপিওভুক্ত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বোচ্চ আশ্বাস দেন পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ।
কুমারী রেখা রানী গার্লস হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে প্রতিষ্ঠাতা কুমারী রেখা রানী ওঝার এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪১ সালে কোটালীপাড়ার বুড়ুয়া গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা রেখা রানী ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তবে তীব্র আর্থিক সংকট, পারিবারিক অনীহা ও তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই তার শিক্ষাজীবন থমকে যায়।
কম বয়সে বাবা বিয়ে দিতে চাইলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে নার্সিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং স্বাস্থ্যসেবাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘকাল সেবা দেওয়ার পর ২০১৩ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান।
অবসরের পর নিজের ভবিষ্যতের কথা না ভেবে গ্রামের মেয়েদের শিক্ষার আলো ছড়াতে উদ্যোগী হন তিনি। নিজের জীবনের সমস্ত সঞ্চিত অর্থ দিয়ে জমি কিনে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কুমারী রেখা রানী গার্লস হাই স্কুল’।
শুরুতে একটি টিনশেড ঘরে মাত্র একজন শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে পরে সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হয় চারতলা বিশিষ্ট একটি একাডেমিক ভবন। এ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি থেকে তিনটি ব্যাচ সফলভাবে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অনেক সাবেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।
তবে প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বিদ্যালয়টি এখনও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। নিয়মিত বেতন-ভাতা না পাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রায় অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, যা বিদ্যালয়টির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা লিপিকা হালদার এশিয়া পোস্টকে বলেন, শিক্ষকরা নিয়মিত বেতন না পাওয়ায় অনেক অভিভাবক বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। ফলে কেউ কেউ তাদের সন্তানদের অন্য বিদ্যালয়ে সরিয়ে নিচ্ছেন।
জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন রেখা রানী। কয়েক বছর আগে মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য তাকে ভারতে যেতে হয়। সেখানে চিকিৎসার পেছনে সঞ্চিত অর্থের প্রায় পুরোটাই ব্যয় হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে বিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতেও প্রতিদিন তিনি বিদ্যালয়ে আসেন এবং শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি করেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তার একমাত্র আকুতি—নিজের হাতে গড়ে তোলা বিদ্যালয়টি যেন এমপিওভুক্ত হয়ে একটি স্থায়ী রূপ পায়।
প্রতিষ্ঠাতা কুমারী রেখা রানী ওঝা এশিয়া পোস্টকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। পুলিশ সুপার স্বয়ং বিদ্যালয়ে এসে খোঁজখবর নেওয়ায় আমি আনন্দিত ও আশাবাদী। বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলে এলাকার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ আরও প্রসারিত হবে।
জেলা পুলিশ সুপারের আগমন ও সহায়তার আশ্বাসে নতুন করে আশার আলো দেখছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রতিষ্ঠাতা ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং দ্রুত বিদ্যালয়টির এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।



