চাকরির জন্য এনআইডি জালিয়াতি, বড়ভাইয়ের ১৩ বছরের বড় ছোটভাই!

বড়ভাই মহিদুল ইসলামের চেয়ে দুই বছরের ছোট নাজমুল ইসলাম। কিন্তু রেলওয়ের নথিপত্রে নাজমুল এখন বড়ভাই মহিদুলের চেয়ে ১৩ বছরের বড়। জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও শিক্ষা সনদে (সার্টিফিকেট) ১৫ বছর বয়স কমিয়ে জাল-জালিয়াতি করে রেলওয়ের চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন মহিদুল ইসলাম। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা এক অভিযোগে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
মহিদুল ইসলাম ও নাজমুল ইসলাম যশোর সদর উপজেলার দেয়াড়া ইউনিয়নের এড়েন্দা গ্রামের নূর আলী গাজীর ছেলে। মহিদুল খালাসি পদে রেলওয়ের বেনাপোল লোকো অ্যান্ড ক্যারেজ ডিপোতে এবং নাজমুল ক্যারেজ ফিটার গ্রেড-১ পদে চাকরি করছেন।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নাজমুল ইসলাম ২০০৫ সালে রেলওয়ের চাকরিতে যোগদান করেন। তার জাতীয় পরিচয়পত্র (৫৯৯৯০৯০২৬৮) অনুযায়ী জন্ম তারিখ ১৫-১০-১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ, পিতার নাম নূর ইসলাম গাজী। ঠিকানা এড়েন্দা, দেয়াড়া, সদর, যশোর।
নাজমুলের বড়ভাই মহিদুল ইসলাম রেলওয়ের চাকরিতে যোগদান করেন ২০১৯ সালের ১০ জুলাই। রেলওয়েতে দাখিল করা কাগজপত্র অনুযায়ী, মহিদুলের জন্ম তারিখ ১২-০৫-১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ, পিতা- মো. নুর গাজী, ঠিকানা- দেবীপুর, কালিয়া, নড়াইল। ভোটার নিবন্ধনের তারিখ ২০২১ সালের ১৪ জুন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নং- ৪৬৬৫১৫৯৭০৫। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের দুই বছর পর নিজের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা বদল করে মহিদুল ইসলাম পরিচয়পত্রটি তোলেন।
আসল জাতীয় পরিচয়পত্র (৩২৯৯০৬৯২৫৬) অনুযায়ী, মহিদুলের নাম মো. মইদুল ইসলাম, পিতা-নুর আলী গাজী, জন্ম তারিখ- ১০-০১-১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ, ঠিকানা- এড়েন্দা, দেয়াড়া, সদর, যশোর।
অর্থাৎ মাহিদুলের আসল পরিচয়পত্র অনুযায়ী, ছোটভাই নাজমুল ইসলাম তার দুই বছরের ছোট। কিন্তু রেলওয়েতে দেওয়া পরিচয়পত্র অনুযায়ী নাজমুল এখন বড়ভাই মাহিদুলের চেয়ে ১৩ বছরের বড়। এ ছাড়া মহিদুল ইসলাম যশোর সদর উপজেলার বাজেদুর্গাপুর আঞ্জুমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির যে সনদপত্র নিয়ে চাকরি করছেন, সেটিও সঠিক নয়। দুদকে এ বিষয়ে একটি পত্রও দিয়েছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে এম আসাদুজ্জামান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, মহিদুলসহ ওই সময় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রাম কর্তৃক ৮৬৩ জন খালাসি নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক চট্টগ্রাম-২ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে ২০২১ সালে মামলা হয়। সেই মামলা এখনও চলমান রয়েছে। ওই মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে মহিদুলের স্কুলের সনদ জাল বলে নিশ্চিত করেন প্রধান শিক্ষক। কিন্তু তখন তার জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতির তথ্য পাওয়া যায়নি। এখন এই জালিয়াতি নিয়ে দুদক প্রধান কার্যালয়েও অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
মহিদুল ও নাজমুলের প্রতিবেশী রাফসান জনি ও ইকবাল বলেন, মহিদুল ও নাজমুল আপন দুই ভাই। তাদের মধ্যে মহিদুল ইসলাম বড় এবং নাজমুল ইসলাম ছোট। কিন্তু এখন শুনি কাগজপত্র জালিয়াতি করে মহিদুলের চেয়ে নাজমুল ১৩ বছরে বড়। এ ধরনের প্রতারণা মেনে নেওয়া যায় না।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মহিদুল ইসলাম দাবি করেন, নাজমুল তার বড়ভাই। কাগজপত্রে জালিয়াতির অভিযোগ সঠিক নয়। চাকরির জন্য তিনি কোনো জাল-জালিয়াতি করেননি। মানুষ শত্রুতা করে এসব অভিযোগ দিচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য নাজমুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
জালিয়াতি ও অনিয়মের বিষয়ে রেলওয়ে বিভাগ (পশ্চিমাঞ্চল) পাকশীর ডিভিশনাল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার (ডিএমই) রবিউল ইসলাম বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও সনদপত্র জালিয়াতির কোনো অভিযোগ তিনি পাননি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ওই নিয়োগ নিয়ে চট্টগ্রাম দুদকে একটি মামলা চলমান রয়েছে।