চাকরি ছেড়ে প্রতিমা তৈরির নিপুণ ভাস্কর

ব্যাংকে চাকরি করেছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাতেও (এনজিও) কাজের অভিজ্ঞতা আছে। সুযোগ ছিল সুন্দর ও নিরাপাদ ক্যারিয়ার গড়ার। এসব কিছুর মায়া ছেড়ে তিনি সখ্যতা গড়েছেন মাটির সঙ্গে। হয়ে উঠেছেন প্রতিমা তৈরির পুরোদস্তুর নিপুণ ভাস্কর।
নাম তার কিশোর কুমার বিশ্বাস। বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার খরমখালী এলাকার শেরেবাংলা রোডের বাসিন্দা। বাবা-মা দুজনই মারা গেছেন। একসময় চাকরি করলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিমা তৈরিকে জীবিকার অবলম্বন হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি।
তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর একটি ব্যাংকে চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন কিশোর। পরে এনজিও রেনেসাঁসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। চাকরির পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কাজও চালিয়ে যান। মাটির এই শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও টান থেকে একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি প্রতিমা তৈরির পেশায় যুক্ত হন।

ভাস্কর কিশোর কুমার বিশ্বাস বলেন, আমি ৩৬ বছর ধরে প্রতিমা তৈরি করি। পাঁচ বছর বয়স থেকে শুরু করেছি। দেবী দুর্গাকে ভালোবাসি। এই কাজের প্রতি আমার আলাদা একটা টান আছে। চাকরি করেছি। প্রতিমা তৈরির কাজও চালিয়ে গেছি। এখন এটাই আমার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বর্তমানে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। তার সঙ্গে কাজ করছেন আরও তিন ভাই। চারজন মিলে প্রায় তিন মাস ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এ বছর কিছুটা দেরিতে কাজ শুরু করায় বেড়েছে কাজের চাপ।
দিনের আলো ফোটার সঙ্গে শুরু হয় কিশোরের কর্মব্যস্ততা। বাঁশ, খড়, মাটি ও রং নিয়ে দিনের পর দিন চলে তার কাজ। কাঠামো তৈরি থেকে শুরু করে মাটি দেওয়া, শুকানো, মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলা ও রং-তুলির শেষ আঁচড়—প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন দক্ষতা, ধৈর্য ও সময়।

স্থানীয় বাসিন্দা পূজা দাস বলেন, কিশোর কুমার বিশ্বাস দীর্ঘ দিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। তার তৈরি প্রতিমায় ভিন্নতা থাকে। পূজা সামনে রেখে এখন দিন-রাত পরিশ্রম করছেন তিনি ও তার সহকর্মীরা।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা অরুপ বলেন, ছোটবেলা থেকে কিশোরকে প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখেছি। বছরের পর বছর ধরে তিনি এই কাজ করে আসছেন। তার হাতের তৈরি প্রতিমা দেখতে এবং কিনতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসেন।
পাঁচ বছর বয়সে যে মাটির সঙ্গে কিশোরের পরিচয়, ৩৬ বছর পর সেই মাটিই হয়ে উঠেছে তার জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। নিজের শিল্পীসত্তা আর পরিশ্রম দিয়ে মাটির কাঠামোয় প্রাণের ছোঁয়া দেওয়ার পাশাপাশি এই পেশার মাধ্যমেই চলছে তার ছোট্ট সংসার।
দুর্গাপূজার আনন্দ যখন মানুষের ঘরে ঘরে, তখন সেই আনন্দের প্রতিমূর্তি গড়ে তুলতে নিভৃতে দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কিশোরের মতো কারিগররা। তাদের হাতের নিপুণ ছোঁয়াতেই খড়, বাঁশ ও মাটির কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে দেব-দেবীর প্রতিমায়।

কিশোর কুমার বলেন, গত বছর এখানে ১৮১টি প্রতিমা তৈরি হয়েছিল। এবার ২০১টি প্রতিমা হবে। প্রায় তিন মাস ধরে কাজ করছি। আমার সঙ্গে আরও তিন ভাই আছে। আমরা চারজন মিলে কাজ করছি। আরও প্রায় এক মাস পর কাজ শেষ হবে।
একটি প্রতিমা তৈরিতে ন্যূনতম এক সপ্তাহ সময় লাগে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বছর নতুন আঙ্গিকে প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। আমি একটু দেরিতে কাজে এসেছি, তাই কাজের চাপও বেশি। অনেকগুলো প্রতিমা তৈরি করতে হচ্ছে। প্রতিটি প্রতিমার কাজ শেষ করতে অনেক সময় লাগে।
কিশোর কুমার আরও বলেন, এবারের প্রতিমায় থাকছে বৈচিত্র্য। দেবী দুর্গার পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে বড় আকারের লোকনাথের প্রতিমা। এর পাশেই তৈরি হচ্ছে কল্কি অবতারের প্রতিমা। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী–কল্কি অবতারকে কলিযুগের শেষ অবতার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

