
ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে লিবিয়া পাড়ি দিয়েছিলেন সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের দুই যুবক। সাগরপথে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু যাত্রার পর কেটে গেছে সাত মাস, পরিবারের সঙ্গে নেই কোনো যোগাযোগ, মেলেনি তাদের সন্ধানও। ছেলেদের খোঁজে একের পর এক দ্বারে ঘুরেও কোনো উত্তর পাননি স্বজনরা। এর মধ্যে দীর্ঘদিন আশ্বাস দিয়ে আসা অভিযুক্ত দালালের পরিবার ঘরবাড়ি তালা দিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। এখন উৎকণ্ঠা আর হতাশায় দিন কাটছে ওই দুই যুবকের পরিবারের সদস্যরা।
নিখোঁজ দুই যুবক হলেন- দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের বড় নগদীপুর গ্রামের কৃষক ফরিদ মিয়ার ছেলে আতিকুর রহমান (১৯) এবং কাউয়াজুরি গ্রামের গুলজার মিয়ার ছেলে এয়র মিয়া (২৪)। একই দালালের মাধ্যমে গ্রিসে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়ে প্রায় একই সময়ে নিখোঁজ হন তারা। তবে এসব ঘটনায় বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল পর্যন্ত দিরাই থানা বা অন্য কোথায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেননি ওই যুবকের পরিবার।
অভিযুক্ত দালালরা হলেন, একই এলাকার ছোট নদগীপুর গ্রামের রাজু মিয়া ও তার বাবা স্বাধীন মিয়া। স্বাধীন মিয়া দেশে অবস্থান করলেও রাজু মিয়া ইটালিতে অবস্থান করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে নদগীপুর গ্রামের স্বাধীন মিয়ার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ইটালিতে অবস্থানরত তার ছেলে রাজু মিয়ার সাথে ওয়াটস অ্যাপে যোগাযোগ করলে তিনি সবকিছু অস্বীকার করে অভিযোগ মিথ্যা দাবি করেন। আতিকুর রহমান ও এয়র মিয়া নামের কাউকে তিনি চিনেন না বলে জানান।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, কাউয়াজুরি গ্রামের এয়র মিয়ার জন্য দেওয়া ৯ লাখ টাকার মধ্যে আড়াই লাখ টাকা ফেরত পেয়েছেন তার বাবা গুলজার মিয়া। নদগীপুর, দৌলতপুর, চয়হারা, কাউয়াজুরি গ্রামের মানুষ নিয়ে অন্তত ৪ বার সালিশ করে এই টাকা উদ্ধার করেছেন তিনি।
নিখোঁজ দুই যুবকের পরিবার ও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দিরাইয়ের ছোট নগদীপুর গ্রামের স্বাধীন মিয়ার ছেলে রাজু মিয়া আগে লিবিয়া থাকতেন। বর্তমানে তিনি ইটালিতে থাকেন। তিনি এলাকার কয়েক যুবককে সাগর পথে অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে গ্রিসে পাঠিয়েছেন।
নিখোঁজ থাকা আতিকুর রহমানের বাবা ফরিদ মিয়া বলেন, ৭ মাস আগে গেল বছরের পৌষ মাসে ১৩ লাখ টাকায় স্বাধীন মিয়ার পরিবারের সঙ্গে মৌখিক চুক্তিতে আমার দ্বিতীয় ছেলে আতিকুর রহমানকে গ্রিসে পাঠানোর উদ্যোগ নেই। এরপর ৮টি গরু বিক্রি, নিজের বন্দক রাখা জমি অন্যকে দিয়ে ও ২ লাখ টাকা ঋণ করে সাড়ে ৮ লাখ টাকা স্বাধীন মিয়ার কাছে তুলে দেই। স্বাধীন মিয়ার ভাই ফুল মিয়া ও স্থানীয় ইউপি সদস্য নুর আলমের হাতে গণনা করে টাকাগুলো দেওয়া হয়।
তিরি আরও বলেন, গত ৭ মাস আগে আতিকুরকে সাগর পথে লিবিয়া থেকে গ্রিসে পাঠানোর কথার পর আর কোনো যোগাযোগ নেই ওর। স্বাধীন মিয়া ও তার ছেলের কাছে ছেলের সন্ধান জানতে চাইলে বলেন, আতিকুর একটি দ্বীপের কারাগারে আটক আছে। একেক সময় একেক ধরনের তথ্য জানাচ্ছে। সম্প্রতি স্বাধীন মিয়ার পরিবার ঘর-বাড়ি তালাবদ্ধ করে গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। অনেক কষ্ট করে সাড়ে ৮ লাখ টাকা দিয়েছি। ৭ মাস ধরে ছেলের কোনো সন্ধান নেই। এখন আমরা কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।
নিখোঁজ এয়র মিয়ার বাবা গুলজার মিয়া বলেন, আমার বড় ছেলে এয়র মিয়াকে গ্রিসে পাঠানোর জন্য নগদীপুরের স্বাধীন মিয়ার পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়। স্বাধীন মিয়ার ছেলে রাজু মিয়া আমার ছেলেকে লিবিয়া নিয়ে কয়েক মাস রাখে। এরপর ৭ মাস আগে বলছিল, লিবিয়া থেকে গেমের মাধ্যমে (ছোট বোটে করে সাগরপথে) নাকি গ্রিসে পাঠাচ্ছে, এরপর থেকে আর ছেলের কোনো খোঁজ-খবর নেই।
তিনি আরও বলেন, ছেলের অবস্থান ও টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নদগীপুর, কাউয়াজুরি, ছয়হারা, দৌলতপুর গ্রামের লোকদের নিয়ে ৩-৪ বার সালিশ করেছি। কয়েক দফা সালিশের পর স্বাধীন মিয়া মাত্র আড়াই লাখ টাকা ফেরত দিয়েছে। বাকি টাকা ফেরত দেয়নি, ছেলের কোনো খবরও দিচ্ছে না। এখন স্বাধীন মিয়ার বাড়ি-ঘর তালা দেখা যাচ্ছে, সবার মোবাইল নম্বরও বন্ধ। ছেলের চিন্তায় ঘুম আসে না, আমি দুইবার স্টোকে আক্রান্ত করেছি।
জগদল ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুর আলম বলেন, স্বাধীন মিয়ার পরিবারের মাধ্যমে গ্রিসে যেতে ইচ্ছুক দুই যুবক নিখোঁজ থাকার ঘটনাটি সত্য। পুরো এলাকার মানুষই জানেন। গুলজার মিয়ার অভিযোগের পর চার গ্রামের একাধিকবার সালিশ হয়েছে, স্বাধীন মিয়া ৩ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছে। এখন স্বাধীন মিয়ার ঘরবাড়ি বেশ কিছুদিন তালাবদ্ধ দেখা যাচ্ছে। দুই যুবকের পরিবার আইনগত কোনো ব্যবস্থা নিতে চাইলে আমরা যতটুকু জানি সেটুকু বলব।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এমন কোনো ঘটনার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ থাকা যুবকদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
