logo

সড়কের দুরবস্থায় সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে কমেছে পর্যটক-রাজস্ব

সড়কের দুরবস্থায় সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জে কমেছে পর্যটক-রাজস্ব
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের বড় একটি অংশ পড়েছে সাতক্ষীরায়। দেশের ছয়টি জেলাজুড়ে বিস্তৃত এই বনাঞ্চলের কাছাকাছি সড়কপথে যাওয়া যায় সাতক্ষীরা থেকে। ফলে প্রতিবছরই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ। তবে এবার সেই চিত্রে ভাটা পড়েছে। কমেছে পর্যটকের সংখ্যা, যার প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসা ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায়।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের কলাগাছিয়া ও কচিখালী পর্যটকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। এর পাশাপাশি সুন্দরবনসংলগ্ন দেবহাটার রূপসি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এবং শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জের আকাশলীনা ইকো ট্যুরিজম সেন্টারও টানে পর্যটকদের। ইছামতী নদীর তীরের রূপসি ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর আকাশলীনার নানা আয়োজন সুন্দরবন ভ্রমণে যোগ করে বাড়তি আকর্ষণ। তবে পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও এবার সাতক্ষীরা রেঞ্জে পর্যটকের কাঙ্ক্ষিত চাপ নেই। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এর অন্যতম কারণ হিসেবে সাতক্ষীরা-শ্যামনগর সড়কের বেহাল দশাকে দায়ী করছেন।

বন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে প্রায় ১৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। চলতি বছর একই সময়ে রাজস্ব আদায় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ রাজস্ব আদায় কমেছে ৬৫ শতাংশের বেশি।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, রাজস্ব কমে গেলে সুন্দরবনের সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজও ব্যাহত হয়। পর্যটন না বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

প্রজনন মৌসুমকে কেন্দ্র করে তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ ছিল। ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন আবার খুলে দেওয়া হয়।

বুড়িগোলিনী ফরেস্ট অফিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. এরফান উদ্দিন বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য গাইড ও নিরাপত্তাকর্মী দেওয়া হচ্ছে। বন বিভাগের টহল দলও পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, ‘সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া গেলে নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’

সড়কের বেহাল দশা নিয়ে জানা যায়, সাতক্ষীরা থেকে শ্যামনগর পর্যন্ত মহাসড়ক প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। এ কারণে সড়কের বিভিন্ন অংশে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। ধুলাবালি, খানাখন্দ ও যানজটের কারণে সড়কটি অনেক জায়গায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি পরিবহন তাদের সেবা বন্ধ করে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে সওজ সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার পারভেজ বলেন, প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং কার্যাদেশ পেতেই প্রায় দুই বছর সময় চলে যায়। যদিও প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত, কিন্তু মূল নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হয় ২০২৫ সালের জুলাই-অক্টোবরে। অর্থাৎ কাজের জন্য কার্যত সময় পাওয়া যায় মাত্র ১১ মাস। এই কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি তাদের।

তিনি বলেন, প্রকল্পে শুধু সড়ক প্রশস্তকরণ নয়, শহরের লাভনী মোড় থেকে আলীপুর চেকপোস্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ফোর লেন সড়ক নির্মাণ এবং কুলিয়া, পালুদি ও বেতখালী এলাকায় তিনটি নতুন সেতুও নির্মাণ করা হবে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুন্দরবনে যাওয়ার প্রধান সড়কপথের এই দুরবস্থার কারণে অনেক পর্যটক সাতক্ষীরায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।

সুন্দরবনের নৌকার চালক শরিফুল ইসলাম বলেন, তিন মাস পর সুন্দরবন খুলে দেওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম পর্যটক আসবেন। সেই অনুযায়ী নৌকা মেরামত করে প্রস্তুত করেছিলাম। কিন্তু রাস্তা খারাপ হওয়ায় মানুষ আসতে পারছে না। সারাদিন নৌকা ঘাটে বাঁধা থাকে, ট্রিপ ও ভাড়া নেই। আমরা বেকার বসে আছি।

আরেক নৌকা চালক বলেন, পর্যটকদের অনেকেই তাদের কাছে সড়কের দুরবস্থার কথা বলেন। পাশাপাশি পর্যটকদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই এবং নৌকায় ওঠার ঘাটও ভালো নয়। পর্যটক আসবে, এই আশায় ঋণ করে নৌকা মেরামত করলেও কাঙ্ক্ষিত পর্যটক না আসায় তারা বিপাকে পড়েছেন। তবে শীত মৌসুমে পর্যটক বাড়বে বলে তারা আশা করছেন।

সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের ওপর নির্ভর করে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ব্যবসা ও কর্মসংস্থান। নৌকার চালক, পর্যটক পরিবহন, খাবারের দোকানসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটক কমে যাওয়ায় এসব মানুষের আয়ও কমেছে।

সিলেট থেকে সুন্দরবন দেখতে আসা এক পর্যটক বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ তার খুব ভালো লেগেছে। তবে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। সুন্দরবনে আরও ভালো রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট বা ছোট পরিসরের বিনোদনব্যবস্থা থাকলে পর্যটকেরা আরও বেশি সময় কাটাতে পারতেন। সুন্দরবনকে বাংলাদেশের গর্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের এখানে আসা উচিত।

আরেক পর্যটক বলেন, সুন্দরবনের সুন্দরী ও কেওড়া গাছসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ তাদের খুব ভালো লেগেছে। তবে আসার রাস্তা খারাপ।

উপকূলীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল হালিম বলেন, সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে পর্যটক যত বাড়বে, স্থানীয় অর্থনীতিও তত চাঙা হবে। দোকানপাটের বেচাকেনা বাড়বে এবং সরকারি রাজস্বও বাড়বে।

তিনি বলেন, সাতক্ষীরার সড়কের কাজ দ্রুত শেষ হলে পর্যটক আরও বাড়তে পারেন। রাস্তার কারণে অনেক পর্যটক পিছিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত যাত্রীছাউনি নেই। এগুলো করা গেলে পর্যটন আরও বিকশিত হবে। তবে পর্যটকেরা সুন্দরবনে এলে বন বিভাগ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যই সাতক্ষীরার সবচেয়ে বড় পর্যটন সম্পদ। তবে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি। সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হলে আসন্ন শীত মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে, এমন প্রত্যাশা তাদের।