logo

ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিলেন চিকিৎসকরা

ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিলেন চিকিৎসকরা
ছবি : সংগৃহীত

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সিসিউতে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে এক রোগীর মৃত্যু ঘিরে ইন্টার্ন চিকিৎসককে মারধরের ঘটনায় ছেলেকে কানধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত দিয়েছে চিকিৎসকরা।

শনিবার (১৩ জুন) দুপুর ২ টায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার রিফাতকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে তার লাশ বুঝে দেয় চিকিৎসকরা। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা।

রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোর ৩টা ৩৫ টায় রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার নূর নাহার বেগমকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সিসিউতে ভর্তি করা হয়। ভর্তির কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় সময়মতো অক্সিজেন না দেওয়া ও চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মৃতের ছোট ছেলে রিফাত হোসেন। একপর্যায়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এসময় ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী ইনডোর অফিসার ডা. রাকিব হাসান মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় দুপুর ২টা ৩০ পর্যন্ত লাশ আটকে রেখে চিকিৎসা সেবা বন্ধ রেখে আন্দোলন করে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি তিন ঘণ্টা জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। পরে মৃতের ছেলে রিফাত হোসেনকে বাসা থেকে ডেকে এনে মায়ের লাশ ফেরত দেওয়ার শর্তে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের একটি কক্ষে কান ধরে ১০ বার ওঠবস করানো হয়। এরপর মায়ের লাশ ফেরত দেন চিকিৎসকরা। এ ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় সমালোচনা। লাশ আটকে রেখে ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় লোকজন।

মৃত নুর জাহানের বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু জানান, তার স্ত্রী ফোন করে মায়ের অসুস্থতার খবর দেন। হাসপাতালে এসে দেখেন, উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে মায়ের লাশ আটকে রাখা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পরও লাশ নামিয়ে নেওয়া হয়। লাশ দিতে গড়িমসি করায় বেলা দেড়টার দিকে লাশ নেওয়ার দাবিতে মেডিক্যাল মোড় এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা।

প্রত্যক্ষদর্শী, ইন্টার্ন চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কার্ডিওলজি বিভাগে অক্সিজেন না দেওয়ায় মায়ের মৃত্যুর পর কর্তব্যরত সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. রাকিবুল হাসান, ইন্টার্ন চিকিৎসক নাঈমের ওপর চড়াও হন ছেলে রিফাত। এ সময় হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

এর প্রতিবাদে ভোর থেকে কয়েকজন ইন্টার্ন হাসপাতালে ডেড হাউজের সামনে অবস্থান নেন। তারা মৃতের ছেলেকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত লাশ না দেওয়ার ঘোষণা দেন। সকাল ১০টা থেকে হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে চিকিৎসকরা জরুরি বিভাগে তালা দিয়ে দিয়ে ধর্মঘট শুরু করেন। এর মধ্যে কয়েক দফায় লাশ নিতে গিয়ে স্বজনরা ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মর্গের সামনে আসেন। খবর পেয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান ঘটনাস্থলে এসে লাশ স্বজনদের দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের অনুরোধ জানান। কিন্তু সে অনুরোধও রাখেননি চিকিৎসকরা। লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে গেলে বাধা দেন এবং আটকে রাখেন।

রংপুর ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিরাজ বলেন, আমরা সকাল থেকে বলে আসছিলাম লাশ নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। তবে যে ব্যক্তি চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেছে তাকে এখানে আসতে হবে। যেহেতু আমাদের দাবি তাকে আইনের আওতায় আনার, এরপরই লাশ নিয়ে যেতে দেব বলেছি আমরা। বিকালে অভিযুক্ত ছেলে এসে কান ধরে ওঠবস করে ক্ষমা চেয়ে লাশ নিয়ে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। রোগীকে হাসপাতালে আনার পরপরই মৃত্যু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দায়িত্বরত চিকিৎসকের গাফিলতি ছিল না। কোনো কারণ ছাড়াই চিকিৎসক নাঈম, রাকিবসহ অন্যদের মারধরের চেষ্টা করা হয়। এমনকি দায়িত্বরত নার্সের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করা হয়েছে। রোগীর স্বজনরা যে আচরণ করেছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত বিষয়ে তিনি বলেন, এটিও খুবই নিন্দনীয় ঘটনা।