logo

নামে পরিবেশবান্ধব কারখানা, ভেতরে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে ইট

নামে পরিবেশবান্ধব কারখানা, ভেতরে কাঠ পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে ইট
পঞ্চগড়ের বোদায় ‘এ অ্যান্ড এ অটো ব্রিকস’ ইটভাটায় কয়লার বদলে পুড়ানো হচ্ছে বনের কাঠ ও কাঠের গুঁড়া। ছবি : এশিয়া পোস্ট

পরিবেশবান্ধব কারখানার দাবি করলেও পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ‘এএন্ডএ অটো ব্রিকস’ ইটভাটায় পুড়ছে কাঠ ও কাঠের গুঁড়া। কয়লার সংকটের অজুহাতে প্রতি রাতেই ট্রাকে করে আনা কাঠের খড়ি ও বিপুল কাঠের গুঁড়া কয়লার সঙ্গে মিশিয়ে চুল্লিতে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে হুমকির মুখে পড়ছে আশপাশের পরিবেশ, ফসলি জমি ও জনস্বাস্থ্য।

সম্প্রতি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার সাকোয়া চন্দনবাড়ী এলাকায় অবস্থিত পরিবেশবান্ধব কারখানা হিসেবে পরিচিত ওই ইটভাটায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। তবে ঘটনার সত্যতা আংশিক স্বীকার করে প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সব সময় নয়, মাঝে মাঝে কিছু কাঠের খড়ি ব্যবহার করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ইটভাটার এক কোণে শত শত বস্তা কাঠের গুঁড়া এবং স্তূপ করে রাখা হয়েছে বনের গাছের খড়ি। দিনের বেলায় এসব কিছুটা আড়ালে রাখা হলেও গভীর রাতে কাঠ ও কাঠের গুঁড়া কয়লার বিকল্প হিসেবে চুল্লিতে দেওয়া হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এতে আশপাশের ফসলি জমি, ফলদ গাছপালা ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে নির্গত কালো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পুরো এলাকার পরিবেশ।

চিকিৎসক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইটভাটায় কাঠ ও কাঠের গুঁড়া পোড়ানোর ফলে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম ছাই মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টের মতো রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে শিশু ও বয়স্করা। ধোঁয়ায় থাকা কার্বন মনোক্সাইড রক্তে অক্সিজেন পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করে, যা হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। কাঠ অসম্পূর্ণভাবে পুড়লে বাতাসে বেনজো-এ-পাইরিনের মতো ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান ছড়াতে পারে, যা ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া দূষিত বাতাস গর্ভবতী মা ও গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়া এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার আশঙ্কা থাকে। বাতাসে ভাসমান ছাইয়ের কারণে চোখে জ্বালাপোড়া, চোখের ক্ষতি ও বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগও দেখা দিতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) পঞ্চগড় জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম বলেন, ইটভাটায় জ্বালানি কাঠ ব্যবহার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশেষত এর ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি বয়স্ক ও শিশুদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে। বন ধ্বংস করে ইটভাটায় জ্বালানি কাঠ পোড়ানো আইনিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ক্ষেত্রে তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

পরিবেশের ক্ষতি করে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রবিউল ইসলাম বলেন, সাকোয়া এএন্ডএ অটো ব্রিকস ইটভাটায় কাঠের গুঁড়া ও কাঠের খড়ি বেআইনিভাবে পোড়ানোর বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পঞ্চগড় পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল গফুর বলেন, কাঠ পোড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইটভাটায় কোনোভাবেই কাঠের গুঁড়া কিংবা খড়ি পোড়ানো যাবে না। আমরা দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।

পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক (ডিসি) শুকরিয়া পারভীন বলেন, পরিবেশ ধ্বংস করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন সোচ্চার রয়েছে। এই ইটভাটার বিরুদ্ধে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।

আসিফ আল আজাদ

সম্পাদনা

আসিফ আল আজাদ

সহ-সম্পাদক | এশিয়া পোস্ট