logo

খেজুরগাছে চাঁচ দেওয়া শুরু, রসের অপেক্ষায় গাছিরা

খেজুরগাছে চাঁচ দেওয়া শুরু, রসের অপেক্ষায় গাছিরা
কোমরে দড়ি আর হাতে হাঁসুয়া নিয়ে খেজুরগাছ পরিচর্যায় ব্যস্তে এক গাছি। ছবি : এশিয়া পোস্ট

শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে চুয়াডাঙ্গায় শুরু হয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি। জেলার মাঠ ও সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরগাছগুলো পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। গাছের চাঁচ দেওয়া থেকে শুরু করে নলি ও মাটির হাঁড়ি বসানোর প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে শীতের রস সংগ্রহের মৌসুম ঘিরে গ্রামাঞ্চলে কর্মচাঞ্চল্য বাড়ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই খেজুরগাছ পরিচর্যার কাজে ব্যস্ত গাছিরা। কোমরে মোটা দড়ি ও বাঁশের ঝুড়ি বেঁধে তাতে বাটাল ও ধারালো হাঁসুয়া নিয়ে গাছে উঠছেন তারা। গাছের ময়লা ও অপ্রয়োজনীয় ডালপালা পরিষ্কার করে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে গাছগুলোকে।

দামুড়হুদা উপজেলার লোকনাথপুর গ্রামের গাছি নাজিম উদ্দিন বলেন, ইতিমধ্যে গাছের প্রথম দফার চাঁচ দেওয়া শুরু হয়েছে। আরও দুই দফা চাঁচ দেওয়ার পর গাছে নলি বসানো হবে। প্রায় ১৫ দিন পর রস সংগ্রহের জন্য গাছে গাছে ছোট-বড় মাটির হাঁড়ি বাঁধা হবে।

জীবননগর উপজেলার উথলী গ্রামের গাছি শামসুল ইসলাম বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে গাছ প্রস্তুতের কাজ করছেন তারা। ধারালো দা দিয়ে গাছের চাঁচ দেওয়া হচ্ছে। কয়েক দিন পর নলি ও মাটির হাঁড়ি বসানো হবে। এরপর শুরু হবে খেজুরের রস সংগ্রহ।

রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে খেজুর গাছগুলোকে। ছবি : এশিয়া পোস্ট
রস সংগ্রহের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে খেজুর গাছগুলোকে। ছবি : এশিয়া পোস্ট

চুয়াডাঙ্গার খেজুরের রস ও গুড় স্থানীয় মানুষের রসনা তৃপ্তির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জেলার অনেক পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির ওপর। শীত মৌসুমে গাছিদের কাছ থেকে কাঁচা রস কিনে স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় গুড় ও পাটালি, যা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গায় বর্তমানে ২ লাখ ৮৯ হাজার ১০০টি খেজুরগাছ রয়েছে। পুরো মৌসুমে এসব গাছ থেকে প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ লিটার রস উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত রসের মাত্র ১ শতাংশ কাঁচা অবস্থায় পান করা হয়। বাকি ৯৯ শতাংশ রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়।

চলতি মৌসুমে জেলায় ৩ হাজার মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ মৌসুমে প্রায় ১ কোটি টাকার কাঁচা রস ও ১ কোটি টাকার খেজুরের গুড় বিক্রি হতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। গুড়ের মান বজায় রাখা এবং ভেজাল রোধে গাছিদের বিশুদ্ধ ও মানসম্মত গুড় উৎপাদনের বিষয়ে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরুল ইসলাম বলেন, জেলার গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যে খেজুরগাছের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে আরও বেশি করে খেজুরগাছ রোপণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছিদের ব্যস্ততাও বাড়বে। আর কিছুদিন পরই খেজুরের রস জ্বাল দেওয়ার মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়বে চুয়াডাঙ্গার গ্রামাঞ্চলে। রস ও গুড় ঘিরে জমে উঠবে মৌসুমি বেচাকেনা, প্রাণ ফিরে পাবে গ্রামীণ অর্থনীতির পরিচিত এক অনুষঙ্গ।