৫০ কোটির সরকারি গোডাউন নির্মাণে মিলল মাটি আর পুরোনো রড

ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ইউরিয়া সার সংরক্ষণের সরকারি ‘বাফার গোডাউন’ নির্মাণকাজে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে বালুর চেয়ে অধিক মাটি এবং নতুন রডের জায়গায় পুরোনো রড ব্যবহারে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাবাসীর তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত চলমান নির্মাণকাজ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন দায়িত্বরত প্রকৌশলী।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনে সুষ্ঠু সার সংরক্ষণ ও বণ্টন নিশ্চিত করতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) দেশব্যাপী ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণ করছে। তারই অংশ হিসেবে ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশায় ‘মার্ক বিল্ডার্স লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের নির্মাণকাজে নিম্নমানের বালু, পাথর, ইট ও পুরোনো রড ব্যবহার করা হচ্ছিল। নির্ধারিত বিনির্দেশ (এসটিমেট) উপেক্ষা করে কাজ করায় গোডাউনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা শঙ্কায় সম্প্রতি উত্তেজিত স্থানীয় জনতা কাজ বন্ধ করে দেয়।
এলাকাবাসীর দাবি, নির্মাণকাজে অনিয়মের বিষয়টি নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং নির্ধারিত মান বজায় রেখে পুনরায় কাজ শুরু করা হোক।
এ বিষয়ে ভোলা সদর উপজেলার ২ নম্বর ইলিশা ইউনিয়ন বিজেপির সদস্য সচিব নোমান হাওলাদার এশিয়া পোস্টকে বলেন, এমন জঘন্য দুর্নীতি ও অনিয়ম করা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক। সরকারি নিয়ম ও নির্ধারিত এস্টিমেট অনুযায়ী শতভাগ মান নিশ্চিত করে কাজ করতে হবে। এ কাজের বালু ও নির্মাণসামগ্রী এতটাই নিম্নমানের যে, তা দিয়ে কেউ নিজ বাড়ির উঠানও ঢালাই করবে না।
তিনি আরও বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের সার ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মেগা প্রকল্পের কাজ এক বছর ধরে চলছে। আজ সরেজমিনে গিয়ে দেখি, বালুর চেয়ে মাটির পরিমাণ বেশি। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি-প্রকল্পটি সঠিকভাবে তদারকি করে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হোক।
পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের বিজেপি নেতা মো. রনি বলেন, প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার এই প্রকল্পে নিম্নমানের ইট, বালু ও রড দিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় একশত পিলারের ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। সাইট ইঞ্জিনিয়ারকে জিজ্ঞাসা করলে তিনিও কাজের মান নিয়ে সদুত্তর দিতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, কোনো সরকারি কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। আমরা চাই বাজেট অনুযায়ী গুণগত মানসম্পন্ন মালামাল দিয়েই যেন কাজটি সম্পন্ন করা হয়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা মাসুম মিয়াজী ও এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঢালাইয়ের ভেতরে মাটির চাকা মেশানো রয়েছে এবং পুরোনো রড ব্যবহার করা হচ্ছে। সার ও রাসায়নিক সম্পর্কিত এ ধরনের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নিম্নমানের কাজ ভবিষ্যতে বড় ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করবে।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্ক বিল্ডার্স লিমিটেডের প্রকৌশলী দিদারুর রহমান মানিক নিজের দায় স্বীকার করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভেকু দিয়ে বালু সরানোর সময় কিছু বালুর সঙ্গে মাটি মিশে গিয়েছিল। আমি বারণ করার পরও আমার অনুপস্থিতিতে শ্রমিকরা এ কাজ করেছে। দায়িত্বরত ব্যক্তি হিসেবে এটা আমার ব্যর্থতা, আমি আমার দায় এড়াতে পারি না।
বিসিআইসির পক্ষে দায়িত্বরত উপসহকারী প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। সকালে গিয়ে কিছু ত্রুটি দেখে একটি লটের কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলাম। তবে আমার অনুপস্থিতিতে শ্রমিকেরা নিজ দায়িত্বে কাজ চালু করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছে। এ ধরনের নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করার কোনো নিয়ম নেই।
