logo
Advertisement

কক্সবাজার/অনলাইন প্রতারক চক্রের গোপন আস্তানা, রিসোর্টে সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব

লোকমান হাকিম,কক্সবাজার
অনলাইন প্রতারক চক্রের গোপন আস্তানা, রিসোর্টে সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব
কক্সবাজারে আটক চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক। ছবি : এশিয়া পোস্ট

কক্সবাজারের রামুর হিমছড়ি সমুদ্রসৈকতের পাশে তিনটি রিসোর্ট ও একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারক চক্রের আস্তানা গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement

পুলিশের মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, আড়াই থেকে তিন শতাধিক চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক সেখানে অবস্থান করে গোপনে কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। একটি রিসোর্টের হলরুমে তৈরি করা হয়েছিল কম্পিউটার ল্যাব। ছিল ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ। এসব কক্ষ ও ল্যাব থেকে বিভিন্ন মডেলের ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের দাবি, চক্রটি অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২৫ আগস্ট অভিযানের আগে চক্রটির সদস্যরা পালিয়ে যান। এরপর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল এবং পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একটি দল।

ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার দুটি হোটেল থেকে ছয়জনকে আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে পাঁচজন চীনের এবং একজন তাইওয়ানের নাগরিক। শুক্রবার তাদের কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

রামু থানায় করা মামলার এজাহার, জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) একটি বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে গোপন কার্যক্রম

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত মার্চে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন চীন ও তাইওয়ানের নাগরিক বাংলাদেশে আসেন। পরের মাসে তারা রামুর মেরিন ড্রাইভের মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড বু রিসোর্ট এবং ইলিয়াস ব্রাদার্স নামের একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নেন।

রিসোর্টগুলো ভাড়া নেওয়ার পর ভবনগুলোর পুরোনো সেটআপ পরিবর্তন, নতুন করে সাজসজ্জা, নিরাপত্তাকর্মী ও জনবল নিয়োগসহ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন চক্রটির সদস্যরা। পুলিশের দাবি, পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থাও বিদেশি নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের একটি হলরুমে তৈরি করা হয় কম্পিউটার ল্যাব। পাশাপাশি ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। পুলিশের ধারণা, এসব কক্ষে বিভিন্ন মডেলের আইফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ নানা ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে গোপনে কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল।

নির্মাণ কোম্পানির আড়ালে প্রতারক চক্র

পুলিশের বিশেষ শাখার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকেই বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। বিদেশি নাগরিকেরা আবাসিক হোটেলে অবস্থান করলে তাদের পাসপোর্টের কপি ও অন্যান্য তথ্য ডিএসবি কার্যালয়কে জানানোর নিয়ম থাকলেও চারটি প্রতিষ্ঠান বিদেশিদের ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখে।

পরবর্তীতে ডিএসবি কর্মকর্তারা রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা জানান, ‘বাবর আলী’ নাম ব্যবহার করে চীনের নাগরিক ঝান ইউয়ান ফান এপ্রিল থেকে রিসোর্টগুলো ভাড়া নেন।

পুলিশের বিশেষ শাখার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ‘জিন শিন নির্মাণ কোম্পানি’ নামে একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্থাপনের কাজের অংশ হিসেবে তারা সেখানে অবস্থান করছেন। তবে ডিএসবির অনুসন্ধানে এ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

পুলিশ জানায়, পরে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বাংলাদেশে অবস্থানের বৈধতা, উদ্দেশ্য, ভিসা ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তারা সন্তোষজনক তথ্য বা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি স্থাপনের পক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

রামু থানার পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, গত ২৫ আগস্ট রিসোর্টগুলোতে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চীন ও তাইওয়ানের নাগরিকেরা পেছনের সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অভিযানের সময় মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের একটি হলরুম থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউ, ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ও ২৪টি কানেকশন বোর্ডসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া চীনা পুলিশের র‌্যাংক ব্যাজ, চীনের জাতীয় পতাকা এবং পুলিশ লোগোযুক্ত একটি টাই উদ্ধারের কথাও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, উদ্ধার করা আলামত প্রথমে মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজারের হেফাজতে রাখা হয়েছিল। পরে ৩ সেপ্টেম্বর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সেগুলো জব্দ তালিকামূলে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেয়।

প্রাথমিক তথ্যে সাত ধরনের প্রতারণা

পুলিশ জানায়, সিটিটিসির কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর প্রাথমিকভাবে ধারণা করেন, চক্রটি অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে সাত ধরনের প্রতারণার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিমভাবে বাজার বিশ্লেষণ দেখানো, ভুয়া প্রলোভন দেখানো, ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ জমা নেওয়া, এক্সিট ফ্রড, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন আর্থিক প্রতারণা।

পুলিশের দাবি, কক্সবাজারে অবস্থান করে চক্রটি ইতিমধ্যে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে থাকতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা ভুক্তভোগীর সংখ্যা পাওয়া যায়নি। উদ্ধার করা মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার পর এ বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, ২৫ আগস্ট অভিযানের পরদিন ২৬ আগস্ট ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট পরিদর্শন করে। ২৮ আগস্ট ডিআইজি, সিটিটিসির নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এরপর উদ্ধার করা বিপুলসংখ্যক আইফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং সাউন্ডপ্রুফ কক্ষসহ পুরো সেটআপ নিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।

মামলায় আরও চার আসামি

বৃহস্পতিবার রাতে ছয়জনকে আটক করা হলেও মামলার এজাহারে আরও চারজন চীনা নাগরিকের নাম উল্লেখ করে তাদের পলাতক দেখানো হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২১, ২২, ২৪ ও ২৭ ধারায় মামলা করা হয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) অহিদুর রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

এর আগে শুক্রবার তিনি জানিয়েছিলেন, চক্রটির আরও সদস্য কক্সবাজারে অবস্থান করছেন বলে তথ্য রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং কয়েকজনের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।