Advertisement

জলবায়ু সংকটে বদলে গেছে বনের রূপ, বেড়েছে হাতি-মানুষের সংঘাত

শাওন মোল্লা, জামালপুর
জলবায়ু সংকটে বদলে গেছে বনের রূপ, বেড়েছে হাতি-মানুষের সংঘাত
বনে খাবারের অভাবে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বন্য হাতির দল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাহাড়ে এখন আর আগের মতো সময় মেনে বৃষ্টি হয় না। শুকিয়ে গেছে প্রাকৃতিক ঝিরি ও পাহাড়ি ঝরনা। অবাধে বৃক্ষ নিধন ও পাহাড় কাটার ফলে বন থেকে হারিয়ে গেছে আমলকী, হরিতকী, বহেড়া ও বুনো কলার গাছ। ফলে খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে পড়েছে গারো পাহাড়ের বন্য হাতির দল।

বেঁচে থাকার তাগিদে গত দুই দশক ধরে বনের সীমানা পেরিয়ে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে হাতির দল। এতে সীমান্ত এলাকায় যেমন বাড়ছে হাতি-মানুষের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব, তেমনই জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের অবিবেচকের মতো আচরণের এক ভয়ংকর মাশুল গুনছে স্থানীয় বাসিন্দা ও এই বন্য প্রাণী।

প্রাণীবিদ, বন বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর ও শেরপুর জেলার পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশ বিপর্যয়ের এমন উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, গত এক যুগে (২০১৪-২০২৬) এই অঞ্চলে হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ৪৯ জন মানুষ। বিপরীতে মানুষের পাতা ফাঁদ, বিষটোপ কিংবা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে মারা গেছে ৩৫টি বুনো হাতি।

দিনে লাগে ৩০০ লিটার পানি, বনের ঝিরি এখন মরুভূমি

একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির দৈনিক ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাবার এবং আবহাওয়াভেদে ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। ঘাস, পাতা, গাছের ছাল, শিকড়, কলাগাছ ও বাঁশের কচি কুঁড়ি হাতির প্রধান খাদ্য।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১০-১৫ বছর ধরে হাতি নিয়মিত লোকালয়ে এসে হানা দিচ্ছে, যা ২০ বছর আগেও ছিল বিরল। জামালপুর ও শেরপুর জেলার বালিজুরী রেঞ্জের পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশ এখন বিপর্যয়ের মুখে। বনের ভেতরে হাতির কোনো খাবার নেই। আগে যেখানে প্রাকৃতিক ঝিরি বা ঝরনা ছিল, জলবায়ুর প্রভাবে সেগুলো এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত। ফলে পানির খোঁজে হাতিকে সমতলে নেমে আসতে হচ্ছে। এতে একদিকে হাতির আক্রমণে মানুষের ফসল ও ঘরবাড়ি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের পাতা ফাঁদে প্রাণ হারাচ্ছে বিপন্ন এই প্রাণী।

চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে শেরপুরে। হাতির আক্রমণে শেরপুর জেলায় সর্বোচ্চ ৩০ জন মানুষ এবং সমানসংখ্যক (৩০টি) হাতির মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে বুনো হাতির আক্রমণে ময়মনসিংহে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন, নেত্রকোনায় ৫ জন ও ২টি হাতি এবং জামালপুরে ৪ জন মানুষ ও ৩টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

বন্য হাতির দল লোকালয়ে আসায় মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাড়ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বন্য হাতির দল লোকালয়ে আসায় মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাড়ছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

কেন এত হাতির মৃত্যু?

২০১৫ সালেই সর্বোচ্চ সাতটি হাতির মৃত্যু ঘটেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বিপুলসংখ্যক হাতি মারা যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো মানুষের তৈরি কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিশোধস্পৃহা। যেমন-

বৈদ্যুতিক ফাঁদ: ফসলের খেত ও ঘরবাড়ি বাঁচাতে সীমান্ত এলাকার মানুষ ফসলি জমির চারপাশে জিআই তার দিয়ে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক সংযোগ দিয়ে রাখে। রাতে অন্ধকারে লোকালয়ে আসার সময় সেই ফাঁদে পড়ে বহু হাতির মৃত্যু হচ্ছে।

কাদা ও বিষটোপ: বনের ঝিরিগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় পানির খোঁজে লোকালয়ের ডোবা বা পুকুরে নামতে গিয়ে কাদা আটকে কিংবা বিষাক্ত রাসায়নিকের কবলে পড়ছে হাতি।

করিডোর দখল: হাতির আদিম চলাচলের পথ বা করিডোরগুলো মানুষ ঘরবাড়ি নির্মাণ ও চাষাবাদের জন্য দখল করে নেওয়ায় হাতির দল দিকভ্রান্ত হয়ে মানুষের মুখোমুখি হচ্ছে। যার শেষ পরিণতি ঘটছে প্রাণহানিতে।

স্থানীয়দের আকুতি

পাহাড়ের বাসিন্দা জয়দাঙ্গো বলেন, ১৫ বছর ধরে হাতি এলাকাতে আসছে। এর আগে ওরা পাহাড়ের ভেতরেই থাকত। পাহাড়ে পর্যাপ্ত খাবার নেই। আগে যেমন কলাগাছ, আমলকী, হরিতকী ও বহেড়ার মতো বনের কিছু গাছ ছিল—সেসময় হাতি পাহাড়ের ভেতরেই থাকত। এখন আমরা যখনই ফসল লাগাই তখন হাতি আসে, আবার ঘরে ফসল তোলার সময় এসে সব নিয়ে যায়।

সীমান্তবর্তী বালিজুরী এলাকার কৃষক রমজান আলী বলেন, ‘হাতির কোনো দোষ নেই ভাই। বনের ভেতর ওদের খাবার আর তৃষ্ণা মেটানোর পানি নেই, ওরা জঙ্গল ছেড়ে সমতলে নামবে না তো কোথায় যাবে? কিন্তু ওদের ঠেকাতে গিয়ে মানুষ বিদ্যুতের তারের ফাঁদ পাতে, মশাল নিয়ে তাড়া করে—তখন দেখা যায় হাতি মারা যাচ্ছে। আবার হাতি খেপে গেলে মানুষের জান যাচ্ছে। আমরা এই হাতি-মানুষের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে বাঁচতে চাই।’

বনে খাবারের অভাবে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বন্য হাতির দল। এতে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের ফসল ছবি: এশিয়া পোস্ট
বনে খাবারের অভাবে লোকালয়ে হানা দিচ্ছে বন্য হাতির দল। এতে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের ফসল ছবি: এশিয়া পোস্ট

কৃষক মো. আবদুর রশিদ বলেন, হাতির দল লোকালয়ে নামলে আমাদের কষ্টের সীমা থাকে না। এবার ধারদেনা করে দুই বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম। ফসল পাকার ঠিক আগমুহূর্তে মাঝরাতে ৩০-৪০টি হাতির একটি দল এসে পুরো খেত মাড়িয়ে একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে গেছে। ওরা তো শুধু খায় না, পায়ের নিচে পিষে সব শেষ করে দেয়। আমাদের সারা বছরের খাওয়ার চাল আর পরিবারের ভবিষ্যৎ এক রাতের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—আমাদের ফসলের নিরাপত্তা দেওয়া হোক, আর বনের মধ্যে হাতিদের খাবারের ব্যবস্থা করা হোক।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের হস্তক্ষেপ কীভাবে বনের খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস করছে, তা নিয়ে সাবেক ভিসি ও প্রাণীবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রোকোনুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হলে পাহাড়ে গাছপালা হবে কীভাবে? পাহাড়ের নদী বা ছড়িগুলোর প্রবাহ থাকবে কীভাবে? হাতি পানি পানের সুযোগ পাবে কোথা থেকে? তা ছাড়া পাহাড়ে গাছ জন্মানো বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। হাতি যেসব গাছ খায়, সেগুলোর বড় অংশই বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে। জলবায়ুর কারণে এখন সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হচ্ছে না, বিভিন্ন দিকে খরা দেখা দিচ্ছে। পাহাড়েও একই সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আর এ কারণেই তারা খাবারের সন্ধানে আস্তে আস্তে নিচের ঢালে নেমে আসছে।

বন বিভাগের উদ্যোগ ও নতুন প্রকল্প

বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বালিজুরী রেঞ্জের ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমিতে বর্তমানে প্রায় ১২০টি হাতি রয়েছে। এই বিশালসংখ্যার হাতির জন্য বনের বর্তমান পরিবেশ মোটেও অনুকূল নয়।

ময়মনসিংহ বিভাগের বালিজুরী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া বলেন, হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব কমাতে বনের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বালিজুরী রেঞ্জের প্রায় ১১৫ হেক্টর বনভূমিতে হাতির খাদ্যের উপযোগী বাগান তৈরির কাজ চলমান। এটি সফল হলে হাতি বনের ভেতরেই পর্যাপ্ত খাবার পাবে।

পাহাড়ে পানির সংকট নিয়ে তিনি বলেন, হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন বনভূমিতে ৪০টির মতো কৃত্রিম জলাধার বা লেক তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে হাতির পানির অভাব দূর হবে।

সমাধানের পথ

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা মনে করছেন, বনের ভেতরে কেবল সাধারণ গাছ লাগালেই এই সংকট কাটবে না। বনের গভীরে হাতির প্রিয় খাবার যেমন—বুনো কলা, বাঁশ, আমলকী ও কাঁঠাল গাছের নিবিড় বনায়ন করতে হবে। পাশাপাশি বনের ভেতরে বড় আকারের কৃত্রিম লেক তৈরি করতে হবে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, লোকালয়ে হাতির প্রবেশ ঠেকাতে বিপজ্জনক ও উন্মুক্ত বৈদ্যুতিক তারের বদলে সরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ-চালিত (সোলার) বেষ্টনী স্থাপন করা। এই বেষ্টনীতে স্পর্শ করলে হাতি মৃদু শক খেয়ে বনে ফিরে যাবে, এতে কোনো হাতির প্রাণহানি ঘটবে না এবং প্রাথমিক পর্যায়ে লোকালয়ে হাতির আনাগোনা অনেকটাই বন্ধ করা সম্ভব হবে।

বিষয় :জামালপুর