হবিগঞ্জ/প্রধান শিক্ষক নেই ৪৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে, সহকারীর পদ খালি ৪৯৬টি

হবিগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জেলার এক হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৪৬১টি পদই শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৪৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে কোনো প্রধান শিক্ষক নেই। একই সঙ্গে সহকারী শিক্ষকেরও ৪৯৬টি পদ খালি রয়েছে। সবমিলিয়ে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট ৯৫৭টি শিক্ষকের পদ ফাঁকা পড়ে আছে। এতে ৩ লাখেরও বেশি শিশুর পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত জেলার নয়টি উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদ এক হাজার ৫২টি। এর বিপরীতে কর্মরত ৫৯১ জন, শূন্য ৪৬১টি পদ। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পাঁচ হাজার ৪২৫টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন ৪ হাজার ৯২৯ জন, আর পদ শূন্য রয়েছে ৪৯৬টি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক পদে প্রতি ১০টি পদের মধ্যে চারটির বেশি পদ খালি রয়েছে। শুধু তাই নয়, শূন্য পদ সামাল দিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে দেওয়া হয়েছে চলতি দায়িত্ব। এতে নিয়মিত প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজের পাশাপাশি তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জেলার বানিয়াচং উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের সংকট সবচেয়ে বেশি। এ উপজেলায় অনুমোদিত ১৬৭টি প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৮৭ জন, শূন্য ৮০টি। এ ছাড়া চুনারুঘাটে ১৭০টি পদের মধ্যে কর্মরত ১০১ জন, শূন্য ৬৯টি। মাধবপুরে ১৪১টি পদের মধ্যে কর্মরত ৭৫ জন, শূন্য ৬৬টি। লাখাইয়ে ৭২টি পদের মধ্যে কর্মরত ৩৭ জন, শূন্য ৩৫টি।
হবিগঞ্জ সদরের পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়; সেখানকার ১১৫টি অনুমোদিত প্রধান শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৫৮ জন, আর শূন্য রয়েছে ৫৭টি পদ। নবীগঞ্জে ১৮২টি পদের মধ্যে কর্মরত ১০০ জন এবং শূন্য ৮২টি।
সহকারী শিক্ষকেরও প্রায় ৫০০ পদ খালি
প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক পদেও রয়েছে বড় ঘাটতি। জেলার ৯টি উপজেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ পাঁচ হাজার ৪২৫টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪ হাজার ৯২৯ জন এবং শূন্য রয়েছে ৪৯৬টি পদ।
এই শূন্য পদগুলোর মধ্যে ২১৫টি পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৮১টি পদ নিয়োগযোগ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সরাসরি শিক্ষক সংকট রয়েছে, অন্যদিকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সাময়িকভাবে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
উপজেলাভেদে সহকারী শিক্ষকের উল্লেখযোগ্য সংকটের মধ্যে রয়েছে—বানিয়াচংয়ে ৬৯টি, চুনারুঘাটে ৬৩টি, লাখাইয়ে ৬৫টি, আজমিরীগঞ্জে ৬৩টি, মাধবপুরে ৬৫টি এবং বাহুবলে ৪১টির মতো পদ শূন্য। নবীগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সদরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ খালি রয়েছে।
মোহনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) রুনা লায়লা জানান, প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদেরই চলতি দায়িত্ব দিয়ে প্রশাসনিক কাজ চালানো হচ্ছে। এতে একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য-উপাত্ত তৈরি, দাপ্তরিক যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের অন্যান্য কার্যক্রম সামলাতে হচ্ছে। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের দাবি জানান তিনি।
হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইলিয়াস বখ্ত চৌধুরী জালালের মতে, একজন শিক্ষককে অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব দিলে তার মূল কাজ অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের শেখার মানের ওপর। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের প্রভাব আরও বেশি। কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠদান সামলাতে হচ্ছে, কোথাও আবার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে শিশুদের শিক্ষার মান, ঝরে পড়া রোধ এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টিও। একজন শিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও প্রশাসনিক দায়িত্ব চাপলে নিয়মিত পাঠদান, মূল্যায়ন এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের বাড়তি সহায়তা দেওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শাহ আলম জানান, সম্প্রতি জেলার ২৩৫ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী অক্টোবর মাসেই তাদেরকে স্কুলগুলোতে পদায়ন (পোস্টিং) করা হবে। এরপর সহকারী শিক্ষকের ঘাটতি অনেকটাই কমে যাবে। এ ছাড়া পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ করার কাজও চলছে। এতে হবিগঞ্জ জেলার শিক্ষক সংকট অনেকাংশেই কমে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


