logo

লাখো মানুষের শেষ ঠিকানাতেও সংকট

লাখো মানুষের শেষ ঠিকানাতেও সংকট
বাগেরহাট শহরের সরুই এলাকার ঐতিহ্যবাহী বড় কবরস্থান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বাগেরহাট শহরের সরুই এলাকার ঐতিহ্যবাহী বড় কবরস্থানটি আজ তীব্র জায়গার সংকট ও সঠিক পরিচর্যার অভাবে ধুঁকছে। ১৯৫৯ চার বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা শহরের এই প্রধান কবরস্থানে দীর্ঘ সাড়ে ছয় দশকে ধনী-গরিব, অসহায় ও বেওয়ারিশসহ প্রায় এক লাখ মরদেহের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহারের ফলে কবরস্থানটিতে এখন আর নতুন দাফনের পর্যাপ্ত জায়গা অবশিষ্ট নেই। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল ও পরিচর্যার অভাবে মাঠের একটি বড় অংশ ঘন আগাছা ও জঙ্গলে ঢেকে গেছে। ফলে নতুন করে মরদেহ দাফন এবং স্বজনদের কবর জিয়ারতে এসে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

স্থানীয় অধিবাসী ও জিয়ারতকারীদের দাবি, বাগেরহাট শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানটির পরিবেশ রক্ষা, জায়গার সংকট নিরসন এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, যাদের নিজস্ব জমি বা পারিবারিক কবরস্থানের ব্যবস্থা নেই, তাদের অনেকের শেষ আশ্রয় এই কবরস্থান। আবার বিভিন্ন কারণে অনেকে এখানে স্বজনদের দাফন করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত কবরস্থানটিতে ক্রমেই জায়গার সংকট তীব্র হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়মিত পরিচর্যার অভাব। কোথাও কয়েকটি কবর পরিষ্কার থাকলেও বিস্তীর্ণ অংশে বেড়ে উঠেছে ঘন আগাছা ও জঙ্গল।

কবরস্থানটি শুধু মৃত ব্যক্তিদের শেষ ঠিকানা নয়, স্বজনদের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। তাই এর পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ চান স্থানীয় বাসিন্দা ও কবর জিয়ারত করতে আসা মানুষ।

কবরস্থানে দোয়া করতে আসা মজিদ শেখ বলেন, এখানে আমার দাদি ও সন্তানের কবর রয়েছে। প্রতিদিন আসরের নামাজের পর তিনি কবর জিয়ারত ও দোয়া-দরুদ করতে আসি। পরিবেশ মোটামুটি ভালো থাকলেও কবরস্থানটি আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা গেলে স্বজনদের নিয়ে আসা মানুষের ভালো লাগবে।

আগাছা জন্মে ঢাকা পড়েছে অধিকাংশ কবর। ছবি: এশিয়া পোস্ট
আগাছা জন্মে ঢাকা পড়েছে অধিকাংশ কবর। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল শেখ বলেন,বড় কবরস্থানটি বাগেরহাট শহরের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রতিদিন মানুষ স্বজনদের কবর জিয়ারত করতে আসেন। কিন্তু আগাছা-জঙ্গল ও জায়গার সংকটের কারণে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কবরস্থানটি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ এবং জায়গার সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

মোল্লাহাট থেকে তাবলিগ জামাতে আসা শাফিন আহমেদ বলেন, প্রায় ১৫ বছর আগে এখানে এসে কবরস্থানটি দেখেছিলেন। তখন পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর ছিল। দীর্ঘদিন পর আবার এসে অনেক জায়গায় আগাছা-জঙ্গল দেখে কষ্ট পেয়েছি। শহরের প্রধান কবরস্থান হিসেবে এটি নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

সালাম শেখ বলেন, আগে কবরস্থানটির পরিচ্ছন্নতা দেখে ভালো লেগেছিল। কিন্তু এবার তাবলিগ জামাতের জোড়ে এসে অনেক জায়গা আগাছায় ভরে থাকতে দেখেতে পেলাম। জায়গার সংকট ও পরিচর্যার অভাবে কবরস্থানটির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনে জায়গা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

কবরস্থানের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমি ২০০৪ সাল থেকে এখানে দায়িত্ব পালন করিছি। ১৯৫৯ সাল থেকে কবরস্থানটিতে মরদেহ দাফন করা হচ্ছে। আগে দাফন করা মরদেহের তথ্য নিয়মিত লিখে রাখা হতো না। ২০১১-১২ সালের দিকে তথ্য সংরক্ষণ শুরু হয়।

তিনি বলেন, প্রায় চার বিঘা জমির এই কবরস্থানে বর্তমানে জায়গার সংকট রয়েছে। বর্ষাকালে আগাছা দ্রুত বেড়ে যায়। কিন্তু মাত্র দুজন দায়িত্ব পালন করায় পুরো এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে পরিষ্কার করতে গেলে অন্যদিকে আবার আগাছা জন্মায়। মাঝেমধ্যে পৌরসভা থেকেও পরিচ্ছন্নতার কাজ করা হয়। তবে লোকবল কম থাকায় পুরো কবরস্থান পরিষ্কার রাখা সম্ভব হয় না।

কবরস্থানে আগে কাজ করেছেন মো. ইমরান বলেন, আমার বাবা এখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর চাকরি করেছেন। বাবার সঙ্গে আমি ও কাজ করেছি সে সময় কবরস্থানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু বর্তমানে কেন এমন অবস্থা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবোনা। তবে নিজের বাড়ির পাশে অবস্থিত কবরস্থানের বর্তমান অবস্থা দেখে আমার ও খারাপ লাগে। কারন প্রতিটি মানুষের শেষ ঠিকানা এই মাটি। তাই কবরস্থানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সবার দায়িত্ব।

বড় কবরস্থানে দীর্ঘদিন ধরে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও অসহায় মানুষের সেবায় কাজ করছেন মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ১৯৭৪ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ কাজ শুরু করেন। পরে ১৯৯৫ সালে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম বাগেরহাটে কার্যক্রম শুরু করার পরও সেবামূলক কাজ অব্যাহত রয়েছে।

জয়নাল আবেদীনের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন এবং প্রায় দুই হাজার দুস্থ মানুষকে সহায়তা করেছেন তিনি। অধিকাংশ কাজ নিজের অর্থে করতে হয়। সরকারি সহায়তাও সীমিত।

তিনি বলেন, অবর্তমানেও যেন মানবসেবার কাজ বন্ধ না হয়, সে জন্য একটি স্থায়ী অফিস, উপযুক্ত জায়গা ও ঘর নির্মাণ প্রয়োজন। বর্তমান স্থাপনাটি সংস্কার এবং জায়গাটিকে সেবামূলক কাজের উপযোগী করে তোলাও জরুরি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক মোজবাহ উদ্দিন বলেন,বড় কবরস্থানটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান। এখানকার জায়গার সংকট, পরিচ্ছন্নতা ও অবকাঠামোগত সমস্যার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কবরস্থানটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি জায়গার সংকট নিরসন ও বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনসহ মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বাগেরহাট শহরের গুরুত্বপূর্ণ এই কবরস্থানের জায়গার সংকট নিরসন, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। তাদের মতে, কবরস্থানের জায়গা কীভাবে বাড়ানো যায়, আগাছা পরিষ্কারের জন্য পর্যাপ্ত জনবল কীভাবে নিশ্চিত করা যায় এবং দীর্ঘদিনের দাফনের তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

রাবেয়া খাতুন

সম্পাদনা

রাবেয়া খাতুন

সাব এডিটর | এশিয়া পোস্ট