logo

ছেলের ঘরে ঠাঁই মেলেনি বৃদ্ধা মায়ের, ইউএনওর কাছে অভিযোগের নেপথ্যে কী

রাকিব হাসনাত
সাঁথিয়া, পাবনা
ছেলের ঘরে ঠাঁই মেলেনি বৃদ্ধা মায়ের, ইউএনওর কাছে অভিযোগের নেপথ্যে কী
বাঁ থেকে- বৃদ্ধা মা ও ছেলে। মা-ছেলের অভিযোগ শোনেন সাঁথিয়ার ইউএও। ছবি: এশিয়া পোস্ট

‎২০১৩ সালে স্বামী সিরাজুল ইসলাম মারা যাওয়ার সময় ছেলে সাগর হোসেন ও মেয়ে দুজনই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে আগলে রেখে তাদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেন মুন্নি খাতুন। একসময় মা-ছেলের সম্পর্কও ছিল ভালো। কিন্তু সেই সম্পর্ক এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, শেষ বয়সে অসুস্থ মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি নন ছেলে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে শুনানিতে মাকে সঙ্গে রাখার কথা বললে সাগর বলেন, মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন, আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।

‎পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের বৃদ্ধা মুন্নি খাতুনের ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে শুনানি হয়। সেখানে মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার বিষয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হলেও সমাধান হয়নি। পরে সাগরকে কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়।

‎মা-ছেলের বিরোধ নিয়ে মুখ খুলেছেন মুন্নি খাতুনের বোনের স্বামী মাসুদ আলম ও মেয়ে জামাই হাফিজুল ইসলাম। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে। বিশেষ করে সাগরের বিয়ের পর থেকে মায়ের সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। একাধিকবার পারিবারিক ও স্থানীয়ভাবে সমঝোতার চেষ্টা করেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

‎মাসুদ আলম বলেন, ২০১৩ সালে সিরাজুল ইসলাম মারা যাওয়ার সময় তার ছেলে-মেয়ে দুজনই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। সন্তানদের বয়স কম থাকায় এবং মায়ের কাছ থেকে দূরে চলে যেতে হবে এমন আশঙ্কায় তারা মায়ের বিয়ের বিষয়ে কান্নাকাটি করত। এ কারণে মুন্নি খাতুনও তখন সন্তানদের জন্য বিয়েতে আবদ্ধ হতে রাজি হননি।

‎তিনি বলেন, তখন আমি ঢাকায় চাকরি করতাম। বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করে তাদের দুজনের পড়াশোনার খরচ চালাতাম। তারা সোনাতলা হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছে। প্রায় আট বছর আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে তার মেয়ে ও জামাই চাকরির কারণে চট্টগ্রামে থাকেন।

‎মাসুদ আলমের কথা অনুযায়ী, একসময় মা-ছেলে একসঙ্গেই থাকতেন। সাগরের সঙ্গে তার বোন ও ভাগনের সম্পর্কও ভালো ছিল। প্রায় তিন বছর আগে সাগর সাঁথিয়া পৌর এলাকায় বাসা নেন। পরে তার বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

‎মাসুদ আলমের দাবি, বিয়ের আগেই সাগরের চাকরির ব্যবস্থা করতে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। আত্মীয়স্বজনের উদ্যোগেই তার বিয়ে দেওয়া হয়। তবে বিয়ের পর থেকে মা-ছেলের সম্পর্কে দূরত্ব বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মায়ের সঙ্গে সাগরের বিরোধ তৈরি হয় এবং তিনি মাকে নিজের কাছে রাখতে অনীহা প্রকাশ করেন।

‎তিনি বলেন, আমরা অনেকবার বুঝিয়েছি। বর্তমান চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমানের সামনেও বসা হয়েছিল। কিন্তু সমাধান হয়নি। চেয়ারম্যান তার মায়ের জন্য বিধবা ভাতার কার্ডও করে দিয়েছিলেন। এরপরও মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়া নিয়ে সমস্যা থেকেই যায়।

‎মাসুদ আলমের দাবি, সাঁথিয়ার তৎকালীন ইউএনও রিজু তামান্নার সময়ও বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছিল। তখন মায়ের ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগে সাগরের বেতন বন্ধ করা হয়েছিল।

‎মাসুদ আলম আরও দাবি করেন, মা-ছেলের বিরোধ নিয়ে একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছিল। সেনাবাহিনীও ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল। তবে ছেলের চাকরি চলে যাওয়ার আশঙ্কায় মুন্নি খাতুন ছেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে রাজি হননি।

‎সম্পত্তি নিয়েও বিরোধ ছিল বলে জানান মাসুদ আলম। তার দাবি, জাল দলিলের মাধ্যমে বোনের সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়। জমি লিজ রেখেও সেই টাকাও সে আত্মসাৎ করে। মাকে দোষী বানাতে বিভিন্ন জায়গায় উদ্দেশ্য করে অভিযুক্ত ছেলে ফেসবুক কমেন্টসে বিরূপ মন্তব্য করে যাচ্ছে। পূর্বে তাকেও বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

‎আক্ষেপ করে মাসুদ আলম বলেন, একজন মা সারাজীবন সন্তানদের জন্য কষ্ট করেছেন। অথচ শেষ বয়সে এসে সেই মাকেই সন্তানের কাছে আশ্রয়ের জন্য অন্যের দ্বারে যেতে হচ্ছে। আত্মীয় হিসেবে আমরা অনেক চেষ্টা করেছি যেন সমাধান হয়। কিন্তু কোনোভাবেই সমাধান করতে পারিনি।

সাগরের শ্বশুর বাড়ি ও বউয়ের প্রশ্রয়ে মায়ের সঙ্গে এমন দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি। এক বাপের এক মেয়ে হওয়াতে মেয়ের জেদেও এমন সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।

‎মুন্নি খাতুনের মেয়ে জামাই হাফিজুল ইসলাম জানান, শাশুড়ি ও সাগরের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে তিনি একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছেন। গত বছরের নভেম্বরেও সমঝোতার জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু সাগর সেখানে উপস্থিত হননি।

‎হাফিজুল ইসলাম বলেন, আমি সাগর ও তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমার কথাও তারা রাখেনি। শাশুড়ির ভরণপোষণ করা হয় না। তার হার্টের সমস্যা হলে আমি তাকে পাবনা হাসপাতালে নিয়ে গেছি। এখন সাগরের সঙ্গে তার বোনেরও যোগাযোগ নেই। আমাদের সঙ্গেও সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

‎তিনি আরও বলেন, শাশুড়ির জন্য আমরা সবসময় চেষ্টা করছি। তাদের মধ্যে মিল করানোর জন্য অনেকবার উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু সমস্যা বাড়তে বাড়তে অনেক দূর গড়িয়েছে। এখন একজন অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা চিন্তিত।

মেয়ে আসিফা খাতুন বলেন, আমি এ ঘটনায় অনেক বিব্রত হয়েছি। মাকে সে ভরণপোষণ দেবে না এটা দুঃখজনক। বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমরা সাধ্য অনুযায়ী মাকে দেখাশোনা করে যাচ্ছি। আমার ভাই আমাদের থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছে। সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। আমার ভাই নিজেকে শুধরিয়ে মাকে তার কাছে রেখে ভরণপোষণ দেবে বলে আশা পোষণ করি। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও করেন তিনি।

‎অভিযুক্ত ছেলে সাগর হোসেনকে তার মোবাইলে কল দিলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কল কেটে দেন। এরপর আর ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে ‎সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, অভিযোগের শুনানি হয়েছে এবং বিষয়টি মানবিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। সাগরকে কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। আগামী দুইদিনের মধ্যে সমাধান করতে আবারো ছেলে ও মাকে ডাকা হবে।