শিল্পের বিষে বিবর্ণ ভালুকা, সংকটে খাল-নদী-কৃষি

ময়মনসিংহের ভালুকায় দ্রুত বাড়ছে শিল্পকারখানার সংখ্যা। নতুন নতুন কারখানা, সড়ক ও শ্রমবাজার ঘিরে বদলে যাচ্ছে এলাকার অর্থনীতি। একসময় যে জমিতে ধান চাষ হতো, সেখানে এখন গড়ে উঠেছে শিল্প স্থাপনা। যে খালে বর্ষায় মাছ ধরা হতো, সেটির পানিতে এখন ভাসে কালচে ফেনা; ভেসে আসে তীব্র দুর্গন্ধ। কোথাও কোথাও সেই দূষিত পানি ঢুকে পড়ছে কৃষিজমিতে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, শিল্পায়নের বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা। বিভিন্ন কারখানার তরল ও রাসায়নিক বর্জ্য শোধন না করেই নদী, নালা, খাল, বিল ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে পানির স্বাভাবিক রং ও গন্ধ বদলে যাচ্ছে, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা ও ফসল। আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী। তীব্র দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণে বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভালুকার ঢোবালিয়া পাড়া ও আশপাশের এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে দূষণের এমন ভয়াবহ চিত্র জানা যায়। তাদের ভাষ্য, কারখানার বর্জ্য ফেলার পর থেকে আশপাশের পানি আর আগের মতো নেই। বর্ষার সময় এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে, যখন দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়ে নিচু এলাকা ও কৃষিজমিতে।
ভালুকায় শিল্পকারখানার বিস্তার অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। সহজলভ্য শ্রমিক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সুবিধাজনক যোগাযোগ এবং বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার কারণে এখানে শিল্প বিনিয়োগ বেড়েছে। গড়ে উঠেছে পোশাক, খাদ্য, রাসায়নিক, ব্যাটারি ও অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হলেও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিবেশগত চাপ।
শিল্পকারখানার সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী বর্জ্য পরিশোধন করেই পরিবেশে ফেলার কথা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাস্তবে সব কারখানা এ নিয়ম মানছে না। বিশেষ করে তরল বর্জ্য নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। শিল্পবর্জ্য শোধনের জন্য বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও শুধু ইটিপি স্থাপনই যথেষ্ট নয়; সেটি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করাও জরুরি। কিন্তু কোথাও কোথাও ইটিপি থাকলেও তা সব সময় চালু রাখা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলায় ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্পকারখানার সংখ্যা ১ হাজার ৮৭২টি। এর মধ্যে কেবল ভালুকাতেই রয়েছে ৩৬৬টি কারখানা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পবর্জ্যে ভারী ধাতু, জৈব দূষক বা ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকলে দীর্ঘমেয়াদে মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। এসব দূষক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে মানুষের স্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
শুধু পানি নয়, শিল্পকারখানার ধোঁয়াও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। কিছু কারখানার চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে কারখানাগুলোর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষেরা বাতাসের মান নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন।
এলাকাবাসী জানান, খিরু নদী, মরাপোড়া, লাউতি খাল, কাইয়ার খাল, বিলাইজুড়ি ও জোড়াখালসহ বেশ কয়েকটি জলাশয়ে সরাসরি ফেলা হচ্ছে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য। ভালুকার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের বুক চিরে বয়ে যাওয়া লাউতি খাল মল্লিকবাড়িতে গিয়ে মিশেছে ঐতিহাসিক খিরু নদীতে। কারখানার অবিরাম বর্জ্যে খালের পানি এখন কুচকুচে কালো। সেই বিষাক্ত পানি খিরু নদীতে মিশে দূষিত করছে পুরো নদী। নদীপাড়ে ছড়াচ্ছে তীব্র রাসায়নিক গন্ধ, যার ফলে পাড়ে দাঁড়ানোই দায় হয়ে পড়েছে।
অথচ দুই দশক আগেও লাউতি খাল ও খিরু নদী ছিল স্বচ্ছ পানির উৎস এবং স্থানীয় কৃষি ও জনজীবনের অন্যতম ভরসা। এখন সেচের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকেরা বাধ্য হয়ে এই বিষাক্ত কালো ও রঙিন পানি দিয়েই ধানসহ বিভিন্ন ফসলে সেচ দিচ্ছেন। ভূগর্ভস্থ পানি তুলতে বাড়তি খরচ হওয়ায় দূষিত পানিই তাদের একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ভালুকার মানুষ শিল্পের বিরোধী নন; তাদের দাবি, তারা এমন শিল্পায়ন চান যেখানে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়বে, তবে একই সাথে খাল, নদী, ফসলের মাঠ, মাছ ও সন্তানদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ টিকে থাকবে।
হবিরবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির পর কারখানার দিক থেকে কালো পানি খালে নেমে আসে। সরাসরিও কারখানার বর্জ্য খালে ফেলা হচ্ছে।
কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, লাউতি খাল থেকে শ্যালো মেশিনে পাম্প করে কারখানার বর্জ্যমিশ্রিত কালো পানিই জমিতে দিতে হয়। এই পানি দেওয়ার পর ধানের গোড়া পচে যায়, ফলন কমে যায় এবং চালের মানও খারাপ হয়। আগে যে ফলন পেতাম, এখন আর তা পাই না। বাধ্য হয়ে দূষিত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। দ্রুত খালের পানি দূষণমুক্ত করে নিরাপদ সেচের ব্যবস্থা করা দরকার।
ভালুকার বিভিন্ন জলাশয়ে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা। তাদের দাবি, কয়েক বছর আগেও যেসব খাল ও বিল থেকে নিয়মিত মাছ ধরা যেত, এখন সেখানে মাছের বিচরণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।
মফিদুল মিয়া নামের এক জেলে বলেন, আগে বর্ষার সময় খালে জাল ফেললে ভালো মাছ পাওয়া যেত। এখন পানি কালচে হয়ে যায়, কিছু খাল-বিলে একেবারেই মাছ নেই। কয়েকটি খালে সামান্য মাছ থাকলেও দূষিত পানির কারণে তা খেতে ভয় লাগে।
এ ধরনের সমস্যা শুধু জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির বিষয় নয়, স্থানীয় মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। গ্রামের মানুষের একটি বড় অংশ মাছ ও কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভরশীল। পানিদূষণের কারণে মাছের প্রজনন ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের হিসাবে, গত এক দশকে ময়মনসিংহে আবাদি জমি কমেছে ৪ হাজার ৫৭২ হেক্টর। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলার মোট আবাদি জমি ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮২৩ হেক্টর; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার ২৫১ হেক্টরে। জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যে কৃষিজমি হ্রাসের ক্ষেত্রে ভালুকার পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। শিল্পায়নের কারণে সেখানে দ্রুত বদলে যাচ্ছে ভূমির ব্যবহার। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, বিগত ছয় বছরে কেবল ভালুকাতেই কৃষিজমি কমেছে ১ হাজার ৪৩ হেক্টর।
পরিবেশকর্মীদের মতে, কেবল অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কোন কারখানা কী ধরনের বর্জ্য উৎপাদন করছে, বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে, ইটিপি কতক্ষণ চালু থাকছে এবং নির্গত বর্জ্যে ক্ষতিকর উপাদান আছে কি না—এসব নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
পরিবেশ দূষণের বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার জানানো হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে তাদের অভিযোগ। পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার পর কারখানাগুলো শর্ত মানছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করা হচ্ছে কি না—সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর ভালুকা শাখার সদস্যসচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল বলেন, পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় এখনই কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিল্পায়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে উন্নয়নের নামে কৃষিজমি, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে মানুষের জীবন ও জীবিকা হুমকিতে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে একদিকে যেমন কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে দূষিত হচ্ছে পানি ও মাটি। তাই শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়গুলো কঠোরভাবে বিবেচনা করা এবং পরিবেশদূষণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলন, ময়মনসিংহের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দীন বলেন, শিল্পবর্জ্যে নদী, খাল ও বিলের পানি দূষিত হলে তার ক্ষতিকর প্রভাব শুধু জলজ পরিবেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর। দূষিত পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা ও ফসলের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে ওই দূষিত পানিতে বেড়ে ওঠা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং দূষণ বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের দাবি।
প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের মুন্না বলেন, ভালুকার শিল্পাঞ্চলে উন্নয়নের এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে—একদিকে উঁচু কারখানা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের ব্যস্ততা; অন্যদিকে পাশের খালে দূষিত পানি, দুর্গন্ধ আর হারিয়ে যাওয়া জলজ প্রাণ।
তিনি আরও বলেন, পানি, মাটি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিনিময়ে যে উন্নয়ন, তা কখনোই টেকসই হতে পারে না। শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ প্রয়োজন, তবে শিল্পবর্জ্য যেন কৃষিজমি, খাল-নদী ও মানুষের জীবনে ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য কার্যকর ইটিপি, নিয়মিত বর্জ্য পরীক্ষা ও পরিবেশগত নিরীক্ষার পাশাপাশি আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহের উপপরিচালক মো. এনামুল হক বলেন, ভালুকায় শিল্পকারখানার বিস্তারে কৃষিজমি ক্রমেই আবাদ অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অনেক কারখানা শোধন ছাড়াই রাসায়নিক বর্জ্য খালে ও কৃষিজমিতে ফেলছে। এতে সেচের পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি মাটির জৈব গুণাগুণ ও উপকারী অণুজীবও ধ্বংস হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, শিল্পবর্জ্য যথাযথভাবে শোধন না করে পরিবেশে ছেড়ে দিলে দীর্ঘমেয়াদে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। কারখানাগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকিতে আমাদের দল কাজ করছে।
তিনি জানান, শিল্পকারখানাগুলোকে বর্জ্য পরিশোধন করে তবেই পরিবেশে ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়ম-নীতি না মানলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




