Advertisement

খাগড়াছড়িতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সুদের বেড়াজালে নিঃস্ব বহু পরিবার

এশিয়া পোস্ট নিউজ, খাগড়াছড়ি
খাগড়াছড়িতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীর সুদের বেড়াজালে নিঃস্ব বহু পরিবার
স্বর্ণ ব্যবসায়ী সঞ্জিত ধর। ছবি: সংগৃহীত

খাগড়াছড়িতে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দাদনের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ব্ল্যাংক চেক ও জমির কাগজপত্র জিম্মি রেখে মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত স্বর্ণ ব্যবসায়ী সঞ্জিত ধর খাগড়াছড়ি বাজারের ‘প্রিয়া জুয়েলার্স’-এর মালিক।

Advertisement

ভুক্তভোগীদের দাবি, স্বর্ণালংকার বন্ধক নেওয়ার পাশাপাশি জমির দলিল ও ব্ল্যাংক চেক রেখে উচ্চ হারে সুদ আদায় করেন সঞ্জিত ধর। নির্ধারিত অর্থের চেয়ে অনেক বেশি টাকা পরিশোধ করার পরও ব্ল্যাংক চেকে নিজের মতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে মামলা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ঋণের টাকা পরিশোধের পরও বন্ধক রাখা কাগজপত্র ও চেক ফেরত না দিয়ে উল্টো আইনি নোটিশ পাঠিয়ে মামলা করে হয়রানি করা হয়। এতে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হওয়ার পথে।

ভুক্তভোগী খাগড়াছড়ি সদরের ঠাকুরছড়া এলাকার বাসিন্দা শতাব্দী ত্রিপুরা জানান, পারিবারিক সমস্যার কারণে নিজের স্বর্ণ বন্ধক দিয়ে কয়েক ধাপে দুই লাখ ৪৫ হাজার টাকা নেন। এ সময় তার কাছে থেকে দুটি ব্ল্যাংক চেক রাখা হয়। পরবর্তীতে এককালীন ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে বন্ধকী স্বর্ণ ফেরত চাইলে তা দিতে অস্বীকার করে। একপর্যায়ে দুই চেকের বিপরীতে ৪৭ লাখ দাবি করা হয়। তা দিতে না পারায় লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে দিনের পর দিন হয়রানি করে যাচ্ছেন।

শতাব্দীর স্বামী বিধু ভূষণ ত্রিপুরা জানান, ২০২১ সালের দিকে পারিবারিক সমস্যার কারণে টাকার প্রয়োজন হলে তার স্ত্রী ব্যবহৃত স্বর্ণ বন্ধক দিয়ে টাকা নেন। ওই টাকা পরিশোধ করার পরও তিনি স্বর্ণ ফেরত দেননি, বরং আরও টাকা দাবি করেন। তারা বাধ্য হয়ে আপসের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করলে তিনি তা মানতে নারাজ হন। পরবর্তীতে তার নামে থাকা ব্ল্যাংক চেকে ২০ লাখ ও ২৭ লাখ টাকা বসিয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে হয়রানি করে যাচ্ছেন। তারা এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক ও রিজিয়ন বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত সঞ্জিত ধরের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

চেঙ্গী ব্রিজ সংলগ্ন বলপে-আদম এলাকার বাসিন্দা আরেক ভুক্তভোগী মনিকা রানী দাশ জানান, পারিবারিক সমস্যার কারণে জমির দলিল ও ব্ল্যাংক চেক জমা দিয়ে এক লাখ ১০ হাজার টাকা নেন। ওই সময় সঞ্জিত ধর শতকরা ১০ টাকা হারে সুদ চেয়েছিলেন। কথাবার্তার মাধ্যমে ৭ টাকা হারে সুদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে ৯৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। পরবর্তীতে যখন আরও ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে যান, তখন তিনি বলেন—এ টাকায় হবে না, আরও দিতে হবে। তখন তারা আরও ৫০ হাজার টাকা দেবেন বলে জানান। তবুও তিনি মানতে নারাজ। পরবর্তীতে তিনি ব্ল্যাংক চেকে ৭ লাখ টাকা বসিয়ে মামলা দেন। এরপর বন্ধকী জমির একাংশ বিক্রি করে তাকে ৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলে তিনি মামলাটি তুলে নেবেন বলে জানান। তবে এখনো পর্যন্ত মামলাটি তিনি চলমান রেখেছেন। তারা এখন ভাড়া বাসায় থাকেন এবং সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারা এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।

ইসলামপুরের বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, ২০২২ সালে পারিবারিক আর্থিক সমস্যার কারণে ৬ ভরি স্বর্ণ বন্ধক দিয়ে চার ধাপে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা নেন। একটি সময় যখন তারা টাকাটা পরিশোধ করতে চান, তখন সঞ্জিত ধর ১২ লাখ টাকা দাবি করেন। তখন তিনি ২ লাখ টাকার বিপরীতে ৪ লাখ টাকা দিতে গেলে সেই টাকা তার মুখে ছুড়ে মারা হয়। পরবর্তীতে তার নামে ২০ লাখ টাকার একটি ব্ল্যাংক চেক ইস্যু দেখিয়ে মামলা করা হয়। স্বামী ও আত্মীয়স্বজনসহ তারা ৫ লাখ টাকা দিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলেও তিনি রাজি হননি। তিনি ২০ লাখ টাকাই দিতে হবে বলে দাবি করেন। এছাড়া তার ৬ ভরি স্বর্ণালংকারও ফেরত দিচ্ছেন না এবং বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে ভয় দেখাচ্ছেন।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি বাজারের প্রিয়া জুয়েলার্সের মালিক সঞ্জিত ধর তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে কথা বলতে চাইলে তিনি অসুস্থতার কারণে চট্টগ্রামে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানান। তবে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, তিনি তার বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাাজুস) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সদস্য সচিব সঞ্জয় পাল বলেন, আমরা এ বিষয়ে শুনেছি। যদি শুধু কোনো স্বর্ণসংক্রান্ত বিষয়ে সমস্যা হতো, তবে আমরা সমিতির পক্ষ থেকে বিষয়টি দেখতাম। তবে চেকের মামলার বিষয়ে সমিতির পক্ষ থেকে কোনো সমাধান দেওয়া সম্ভব নয়, এটি তার ব্যক্তিগত বিষয়।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত জানান, এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে কোনো ভুক্তভোগী পরিবার যদি প্রমাণসাপেক্ষে অভিযোগ করেন এবং থানায় মামলা করতে চান, সে ক্ষেত্রে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয় :