Advertisement

ডিসির দেওয়া রুটিনে পড়ে জিপিএ-৫ পেল সাদিয়া

এশিয়া পোস্ট নিউজ, দিনাজপুর
ডিসির দেওয়া রুটিনে পড়ে জিপিএ-৫ পেল সাদিয়া
জিপিএ–৫ পাওয়া সাদিয়া আফরিনকে শুভেচ্ছা জানান জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে মায়ের আবেদন ছিল আর্থিক সহায়তার জন্য। কিন্তু তাৎক্ষণিক টাকা না দিয়ে জেলা প্রশাসক সাদিয়া আফরিনকে দিলেন এক সপ্তাহের পড়া ও নির্দিষ্ট রুটিন। প্রতি বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে সেই পড়া বুঝিয়ে দিতে হতো তাকে। এভাবে চলল টানা এক বছর। শেষ পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে সেই আস্থার প্রতিদান দিলেন দিনাজপুরের এই শিক্ষার্থী।

Advertisement

সাদিয়ার বাড়ি দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়া এলাকায়। তার বাবা মো. সেলিম চালকলের শ্রমিক এবং মা আরফা বেগম বাড়িতে সেলাইয়ের কাজ করেন। তিন মেয়ের মধ্যে সাদিয়া বড়।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি তিন মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা সেলিম-আরফা দম্পতির জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে গত বছরের জুলাইয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন আরফা বেগম। এরপর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি সাদিয়ার পড়াশোনার বিষয়েও জানতে চান। তবে প্রথম দিনেই আর্থিক সহায়তা না দিয়ে সাদিয়াকে সাত দিনের পড়া ঠিক করে দেন তিনি। একই সঙ্গে প্রতিদিনের পড়াশোনার জন্য একটি রুটিনও তৈরি করে দেন।

জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে রাতে দুই ঘণ্টা ও ভোরে দুই ঘণ্টা পড়ার পরামর্শ দেন। রাত ১০টায় ঘুমানো এবং ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসার পাশাপাশি বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলার সময়ও ঠিক করে দেন। বিদ্যালয়ে ক্লাস হোক বা না হোক, নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। রুটিন মেনে চললে চার মাস পর আর্থিক সহায়তার আশ্বাসও দেন তিনি। যদিও পরের মাসেই সাদিয়াকে ৭ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।

প্রতি বুধবার ডিসির কাছে পড়া নিয়ে হাজির

সেই থেকে শুরু হয় সাদিয়ার নিয়মিত বুধবারের যাত্রা। সপ্তাহের পড়া শেষ করে নির্ধারিত সময়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হতো সে। গণশুনানিতে মানুষের নানা অভিযোগ শোনার ফাঁকে জেলা প্রশাসক সাদিয়ার পড়া নিতেন। ভুল হলে সংশোধন করে দিতেন এবং পরের সপ্তাহের জন্য নতুন পড়া ঠিক করে দিতেন। এভাবে টানা এক বছর জেলা প্রশাসকের দেওয়া রুটিন অনুসরণ করে পড়াশোনা করে সাদিয়া। এরপর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় সে। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সাদিয়া।

সাদিয়া স্থানীয় কাদের বকস মেমোরিয়াল হাইস্কুলের শিক্ষার্থী ছিল। এ বছর বিদ্যালয়টি থেকে ৪৩ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২২ জন পাস করেছে। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়াই জিপিএ-৫ পেয়েছে।

টেবিল নেই, কখনও বিছানায় কখনও মেঝেতে পড়া

সরেজমিনে সাদিয়াদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই শতক জমির ওপর ছোট একটি ঘর। ঘরের মাঝখানে বেড়া দিয়ে দুই ভাগ করা হয়েছে। এক পাশে মা-বাবা ও ছোট বোনের থাকার জায়গা, অন্য পাশে সাদিয়া ও তার মেজো বোনের থাকার জায়গা। একটি আলমারির ওপর সাজানো সাদিয়ার বইপত্র। ঘরে পড়ার কোনো টেবিল নেই। কখনও বিছানায়, কখনও মেঝেতে বসেই পড়াশোনা করেছে সে।

মেয়ের সাফল্যে আনন্দিত মা আরফা বেগম বলেন, বই কিনতে না পেরে মেয়ের জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়ে ডিসি স্যারের কাছে আবেদন করেছিলাম। স্যার আমাদের সহযোগিতা করেছেন। শুধু টাকা দিয়ে নয়, মেয়েকে নিয়মিত পড়িয়েছেন, খোঁজখবর নিয়েছেন। আজ মেয়েটা ভালো ফল করেছে। আমি স্যারের কাছে কৃতজ্ঞ।

নিজ বাড়িতে সাদিয়া আফরিন। ছবি : সংগৃহীত
নিজ বাড়িতে সাদিয়া আফরিন। ছবি : সংগৃহীত

সাদিয়ার ফল প্রকাশের পর গত বৃহস্পতিবার তার পরিবারের সদস্যরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে যান। জেলা প্রশাসক সাদিয়াকে অভিনন্দন জানান এবং মিষ্টিমুখ করান।

ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি করে বাবা-মায়ের অভাবের সংসারের হাল ধরতে চাওয়া সাদিয়া আফরিন বলে, প্রথম দিকে ডিসি স্যারের কাছে পড়া দিতে ভয় পেতাম, কিন্তু নিয়মিত চেষ্টা করেছি। স্যার কেবল আর্থিক সহায়তা দেননি, আমাকে বিশাল সাহস দিয়েছেন।

মেয়ের সাফল্যে বাবা মো. সেলিম বলেন, ডিসি স্যার আমার মেয়ের নিয়মিত খোঁজ রেখেছেন, তাকে সহায়তা করেছেন। মেয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পড়ালেখা করতে চায়। জানি না কত দূর পর্যন্ত পড়াতে পারব।

‘সাদিয়াকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন’

সাদিয়ার সাফল্যে খুশি কাদের বকস মেমোরিয়াল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মকসেদ আলী। তিনি বলেন, একমাত্র সাদিয়া আফরিনই আমাদের স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। জেলা প্রশাসক স্যার প্রায়ই আমাদের স্কুলে আসেন, ক্লাসও নেন। সাদিয়াকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন, পড়াতেন। তার ভালো ফলাফলে আমরা আনন্দিত।

জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রথম দিন কথা বলে বুঝেছিলাম, ওর পড়াশোনার বিষয়ে বেশ আগ্রহ আছে। তারপর ওকে একটা চ্যালেঞ্জ দিলাম। ও সত্যি সত্যি রুটিন মেনে হোমওয়ার্কগুলো করেছে।

তিনি বলেন, এমন হাজারো সাদিয়া চারপাশে রয়েছে, যারা লেখাপড়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজ-কলমও পায় না। দিনাজপুরের বেশ কিছু স্কুল ঘুরেছি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। গত দেড় বছরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়ার কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে।

বিষয় :